
প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষের সুস্থ ও নিরাপদ জীবনের অন্যতম ভিত্তি। গাছপালা, বনভূমি, নদ-নদী, খাল-বিল ও তৃণভূমি মিলেই গড়ে ওঠে আমাদের পরিবেশ। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে মানুষের জীবনেও নেমে আসে নানা সংকট—বাড়ে রোগব্যাধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তাই পরিবেশ রক্ষায় বনায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামও পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে বনভূমি সৃষ্টি বা বৃক্ষরোপণকে বনায়ন বলা হয়। আধুনিক নগরায়ন, শিল্পায়ন ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত বনভূমি উজাড় হচ্ছে। এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং মানুষের জীবন ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। এই সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পিত বনায়নের বিকল্প নেই।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা গাছপালা ও উদ্ভিদের গুরুত্ব বারবার উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
“তিনিই সেই সত্তা, যিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন; তা থেকে তোমাদের পানীয়ের ব্যবস্থা হয় এবং তা থেকেই জন্মে উদ্ভিদ, যা তোমরা চারণভূমিতে ব্যবহার করো।”
— সুরা নাহল, আয়াত ১০
আরও ইরশাদ হয়েছে,
“আমি ভূমিকে বিস্তৃত করেছি, তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং তাতে উৎপন্ন করেছি মনোমুগ্ধকর নানা প্রকার উদ্ভিদ…।”
— সুরা কাফ, আয়াত ৭–১১
এসব আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, গাছপালা ও বনভূমি মানুষের জীবিকা, খাদ্য এবং পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত।
বনভূমি ও গাছপালা—
পর্যাপ্ত বনভূমি না থাকলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন ফলদ ও উপকারী বৃক্ষের কথা এসেছে। যেমন—
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আমি তোমাদের জন্য খেজুর ও আঙুরের বাগান সৃষ্টি করেছি।”
— সুরা মুমিনুন, আয়াত ১৯
ইসলাম বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটা নিরুৎসাহিত করেছে। এমনকি যুদ্ধের সময়ও বৃক্ষ ধ্বংস না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“তোমরা কোনো খেজুর গাছ পুড়িয়ে দেবে না এবং অকারণে কোনো বৃক্ষ কাটবে না।”
আরেক হাদিসে এসেছে,
“যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে কাঁটাযুক্ত কোনো বৃক্ষ কেটে ফেলবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।”
— সুনানে আবি দাউদ, হাদিস: ৪৬২৬
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে বনভূমির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় বনাঞ্চল দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কার্যকর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন,
“যদি কিয়ামত এসে যায় এবং তোমার হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সুযোগ থাকলে সেটিও রোপণ করে দাও।”
— মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২৯৮১
গাছ শুধু পরিবেশ রক্ষা করে না, মানুষের খাদ্য, বাসস্থান, জ্বালানি ও ওষুধেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
ইসলামের ইতিহাসে গাছপালা থেকে ওষুধ ব্যবহারের নজির রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ভারতীয় কস্টাস (উদুল হিন্দ) ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে বলেছেন,
“এর মধ্যে সাত ধরনের রোগের আরোগ্য রয়েছে।”
— সহিহ বোখারি, হাদিস: ৫৩৬৮
ইসলামে ফলদ বৃক্ষরোপণকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“কোনো মুসলমান যদি একটি গাছ রোপণ করে বা কোনো শস্য উৎপাদন করে, তারপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা কোনো প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে গণ্য হবে।”
— সহিহ বোখারি, হাদিস: ২১৯৫
অর্থাৎ, একটি গাছ যতদিন মানুষ ও প্রাণীর উপকারে আসবে, ততদিন বৃক্ষরোপণকারী ব্যক্তি সওয়াব পেতে থাকবেন।
ইসলাম শুধু ইবাদত-বন্দেগির ধর্ম নয়; এটি পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবকল্যাণেরও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। কোরআন ও হাদিসে বৃক্ষরোপণ, বন সংরক্ষণ এবং অকারণে গাছ না কাটার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা আজকের জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংকটের প্রেক্ষাপটে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সমন্বিত উদ্যোগে ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করে বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে পারলেই পরিবেশ ও মানবজীবন উভয়ই উপকৃত হবে।