
নতুন শিক্ষাবর্ষকে স্বাগত জানানোর সময় আবারও আমরা ফিরে আসছি জ্ঞানার্জনের পরিসরে—জ্ঞান অন্বেষণ ও তা অর্জনের প্রত্যয়ে। ক্লাসরুম, পাঠচক্র ও জ্ঞানমূলক মঞ্চে সময়কে কাজে লাগানো এবং নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি করার এই পথচলা অনেক কল্যাণময়। জ্ঞানচর্চার পরিবেশ যেন জান্নাতের বাগানের মতো প্রশান্তিময় ও কল্যাণে পরিপূর্ণ।
তাই হে শিক্ষার্থীরা, তোমরা নতুন শিক্ষাবর্ষকে স্বাগত জানাও পরিশ্রম, আন্তরিক নিয়ত, দৃঢ় সংকল্প ও উঁচু মানসিকতা নিয়ে। মনে রেখো, যে চেষ্টা করে সে সফল হয়, আর যে বীজ বোনে সে একদিন তার ফল পায়। আল্লাহর তাওফিকের পর সফলতার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হলো কঠোর পরিশ্রম ও নিরলস প্রচেষ্টা। কবি বলেছেন, ‘যে পরিশ্রম ছাড়া উচ্চ মর্যাদা কামনা করে, সে জীবনের সবটা অপচয় করে অসম্ভবের অন্বেষণে।’
জ্ঞান আল্লাহর পূর্ণতার অন্যতম গুণ। তিনি সবকিছু সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। কী ঘটেছে, কী ঘটবে এবং কী ঘটতে পারে—সবই তিনি জানেন। তিনি দয়া ও জ্ঞানের মাধ্যমে সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি অদৃশ্য সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত; আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে তাঁর অগোচর নয় অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তদপেক্ষা ক্ষুদ্র বা বৃহৎ কিছু; এর প্রত্যেকটি আছে সুস্পষ্ট কিতাবে।’ (সুরা সাবা : ৩)
আল্লাহই মানুষকে এমন জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে আগে জানত না। তিনি মানুষকে দিয়েছেন বুদ্ধি, যাতে সে চিন্তা করতে, বুঝতে ও উপলব্ধি করতে পারে। দিয়েছেন কান—শোনার জন্য, চোখ—দেখার জন্য এবং জিহ্বা—কথা বলার জন্য। তিনি মানুষকে কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘পাঠ করো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাটবাঁধা রক্ত থেকে। পাঠ করো, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না।’ (সুরা আলাক : ১-৫)
আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান দিয়ে সম্মানিত করেছেন, মর্যাদা দিয়েছেন এবং পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি আদম (আ.)-কে সবকিছুর নাম শিক্ষা দিয়েছেন এবং আকাশ ও পৃথিবীর বিভিন্ন বিষয় মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ করো, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি… তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আমি যা জানি তা তোমরা জান না। আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন… তারা বলল, আপনি মহান, পবিত্র। আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের তো কোনো জ্ঞানই নেই। বস্তুত আপনি জ্ঞানময় ও প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা বাকারা : ৩০-৩৩)
জ্ঞান মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। জ্ঞানের মাধ্যমে ব্যক্তি ও জাতি উন্নত হয়, বিজয় অর্জন করে। এটি উত্তম ইবাদত এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। কোরআন জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করেছে। মহান আল্লাহ তাঁর নবী (সা.)-কে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দোয়া করতে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘আর বলুন, হে আমার প্রতিপালক, আমাকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ কর।’ (সুরা তহা : ১১৪)
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেছেন, ‘এটা স্পষ্ট প্রমাণ যে, জ্ঞানের মর্যাদা কত বড়; কারণ আল্লাহ তাঁর নবীকে কোনো কিছুর বৃদ্ধির দোয়া করতে বলেননি, শুধু জ্ঞানের ক্ষেত্রে বলেছেন।’
মহান আল্লাহ আলেমদের মর্যাদা তুলে ধরে বলেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই তাঁকে ভয় করে; আল্লাহ পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।’ (সুরা ফাতির : ২৮)
আল্লাহ তাআলা আলেমদের নিজের ও ফেরেশতাদের সঙ্গে একত্রে তাঁর একত্বের সাক্ষ্যদাতা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, নিশ্চয়ই তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাসক নেই, ফেরেশতাগণ ও জ্ঞানীগণও; আল্লাহ ন্যায়নীতিতে প্রতিষ্ঠিত, তিনি ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই; তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৮)
তিনি আরও বলেন, ‘যারা জানে ও যারা জানে না, তারা কি সমান?’ (সুরা জুমার : ৯)
আর যারা জানে না, তাদের জ্ঞানীদের কাছে জানতে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীগণকে জিজ্ঞাসা করো।’ (সুরা নাহল : ৪৩)
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন।’ (বোখারি : ৭১)
তিনি আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য কোনো পথে বের হয়, আল্লাহতায়ালা তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’ (মুসলিম : ৬৭৪৬)
আমাদের পূর্বসূরিরা জ্ঞান অর্জনের জন্য অসীম কষ্ট স্বীকার করেছেন। তারা প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে দূর-দূরান্তে গেছেন। অভাব, কষ্ট, দুর্দশা ও ক্লান্তি সহ্য করেছেন শুধু জ্ঞান অর্জনের জন্য।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের সকলের একসঙ্গে অভিযানে বের হওয়া সংগত নয়, এদের প্রত্যেক দলের এক অংশ বহির্গত হয় না কেন, যাতে তারা দ্বীন সম্বন্ধে জ্ঞানানুশীলন করতে পারে আর তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের কাছে ফিরে আসবে যাতে তারা সতর্ক হয়।’ (সুরা তওবা : ১২২)
অতএব, হে ছাত্রছাত্রীরা, তোমাদের প্রতিদিনের সময় থেকে জ্ঞানার্জনের জন্য একটি নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ রাখো। জ্ঞানের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করো। কারণ জ্ঞান দুনিয়ায় তোমাদের পাথেয় এবং আখেরাতে মর্যাদা লাভের অন্যতম মাধ্যম।
যা তোমাদের জন্য উপকারী, তা অর্জনে দেরি করো না। শিক্ষার সময়কে অবহেলা করো না। মনে রেখো, সময় চলে যায়, জীবন ফুরিয়ে যায়; আর যা চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না।
জ্ঞান হলো হৃদয়ের জীবন, দৃষ্টিশক্তির আলো, অন্তরের রোগের ওষুধ, বুদ্ধির উদ্যান, আত্মার আনন্দ এবং মন-প্রাণের সান্ত্বনা। এটি বিদেশে প্রবাসীর সঙ্গী, একাকিত্বের সময়ের কথোপকথনের সাথি এবং নিঃসঙ্গতার আপনজন। জ্ঞান সন্দেহ দূর করে এবং সত্যের পথকে স্পষ্ট করে।
জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করা ইবাদত, তা অনুসন্ধান করা সাধনা, তা অর্জনের চেষ্টা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম, তা বিতরণ করা দান এবং তা পড়া ও পড়ানোও ইবাদত। মানুষের জন্য জ্ঞান পানাহারের চেয়েও বেশি প্রয়োজনীয়।
তাই হে ছাত্রসমাজ, তোমরা জ্ঞানার্জনে মনোযোগ দাও। আল্লাহ তোমাদের জন্য জ্ঞান অর্জনের নানা পথ সহজ করে দিয়েছেন। সময় ও সুযোগ দিয়েছেন, প্রযুক্তি ও শিক্ষার বিভিন্ন উপকরণ দিয়েছেন, যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং অনলাইন শিক্ষার প্ল্যাটফর্ম সহজলভ্য করেছেন। তাই পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার আর কোনো অজুহাত থাকা উচিত নয়।
আজ পরিশ্রম করো, কষ্ট সহ্য করো এবং জ্ঞানের বীজ বপন করো, যাতে আগামী দিনে তার সুফল লাভ করতে পারো। মনে রেখো, জ্ঞান এমন এক আলো, যা কখনো নিভে যায় না; এমন এক সম্পদ, যা যত বিতরণ করা যায় ততই বৃদ্ধি পায়।
হে শিক্ষাগুরুগণ, আপনারা আগে নিজেরা শিখুন, এরপর তা শিক্ষার্থীদের শেখান, নিজের জীবনে তার প্রয়োগ করুন এবং অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিন। ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা ও তত্ত্বাবধানের বিষয়ে আপনারা আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ। তাই দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা করবেন না।
শিক্ষার্থীদের আন্তরিক পরামর্শ ও সঠিক দিকনির্দেশনা দিন। কথাবার্তা, আচরণ ও কর্মের মাধ্যমে তাদের সামনে উত্তম আদর্শ হয়ে উঠুন। মনে রাখবেন, শিক্ষা একটি মহা আমানত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
শিক্ষকের কথা শিক্ষার্থীর মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই নিয়ত বিশুদ্ধ করুন, দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করুন এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণের সহায়ক হোন।
একটি সৎ কথা, একটি আন্তরিক পরামর্শ কিংবা একটি সঠিক শিক্ষা কোনো মানুষের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে। এমনকি একজন আদর্শ শিক্ষকের নিষ্ঠা ও প্রচেষ্টা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই নতুন শিক্ষাবর্ষ হোক জ্ঞানার্জন, আত্মগঠন, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের নতুন প্রত্যয়ের বছর। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জ্ঞান ও নৈতিকতার আলোয় আলোকিত হোক ব্যক্তি, সমাজ ও দেশ।