কাবিননামা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দলিল নয়; বরং এটি স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন, অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ও শরিয়তসম্মত দলিল। বাস্তবে কাবিননামা পূরণে অসচেতনতার কারণে বহু ক্ষেত্রে ভুল-ভ্রান্তি ঘটে, যা পরবর্তীতে গুরুতর পারিবারিক, সামাজিক ও আইনি জটিলতার জন্ম দেয়। সাধারণত তিনটি কারণে কাবিননামা পূরণে এই ভুলগুলো হয়ে থাকে। প্রথমত, জানার অভাব। অনেকেই কাবিননামা পূরণকে নিছক একটি প্রথাগত কাজ মনে করেন এবং এর গুরুত্ব ও ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না। ফলে কাজী যেভাবেই ফরম পূরণ করুন না কেন, বর বা বরপক্ষ তা মনোযোগ দিয়ে পড়ার প্রয়োজন মনে করেন না। কাজী বরের সামনে ফরম পেশ করলে অনেক সময় বর না পড়েই স্বাক্ষর করে দেন। পরবর্তীতে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে দেখা যায়, আদালতের রায়ে স্ত্রী কর্তৃক ডিভোর্স বৈধ হলেও শরিয়তগত দিক থেকে বিষয়টি জটিল হয়ে পড়ে এবং মুফতিগণও ফতোয়া দিতে বিড়ম্বনায় পড়েন।
দ্বিতীয় কারণ হলো স্বভাবজাত লজ্জা ও সংকোচবোধ। আমাদের সমাজে বিয়ের মজলিসে পাত্রের পক্ষ থেকে কথা বলা বা আপত্তি তোলাকে অনেক সময় দোষের চোখে দেখা হয়। ফলে কাবিননামায় পাত্রের মতের বিপরীতে কোনো কথা লেখা হলেও তা সংশোধনের দাবি করা হয় না। সামাজিক চাপ ও সংকোচের কারণে অনেকেই নীরবে সবকিছু মেনে নেন, যার ফল ভোগ করতে হয় পরবর্তী জীবনে।
তৃতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো কাজীদের গৎবাঁধা ভাষ্য ব্যবহার। অনেক কাজী কাবিননামার বিভিন্ন ধারায়, বিশেষ করে ১৮নং ধারায়, নিজস্ব তৈরি নির্দিষ্ট ভাষ্য বা সিলমোহরযুক্ত বাক্য ব্যবহার করেন এবং তা সব কাবিননামায় ঢালাওভাবে প্রয়োগ করেন। বর ও কনের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন মনে করা হয় না। এমনকি বর বা কনেপক্ষ নিজস্ব শর্ত লিখতে চাইলে অনেক সময় কাজী তা লিখতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, এটি নিয়মবহির্ভূত। বাস্তবে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কাবিননামার ১৮নং ধারা মূলত বর ও কনের ইচ্ছা অনুযায়ী শর্ত আরোপের জন্যই নির্ধারিত। এখানে কী লেখা হবে এবং কীভাবে লেখা হবে, তা নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার বর ও কনের। কাজীর এতে হস্তক্ষেপ করার কোনো আইনগত বা শরিয়তসম্মত অধিকার নেই। যদি সবার জন্য একই ভাষ্য বাধ্যতামূলক হতো, তবে তা ফরমেই ছাপানো থাকত।
কাবিননামা পূরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি, কারণ এর সঙ্গে দাম্পত্য জীবনের বহু সুবিধা ও অসুবিধা জড়িত। বিশেষ করে ১৭ ও ১৮নং ধারাগুলো ভালোভাবে পড়ে, বুঝে ও ভেবে পূরণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। যেহেতু বিয়ের মজলিসে তালাক বা বিচ্ছেদের বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনেক সময় অস্বস্তিকর মনে হয়, তাই বিয়ের আগেই পাত্র-পাত্রীর অভিভাবকদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ১৮নং ধারার বিষয়টি চূড়ান্ত করে নেওয়া উত্তম। পরে সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজী দিয়ে কাবিননামা পূরণ করাতে হবে। যদি কাজী আগে থেকেই ফরম পূরণ করে রাখেন, তবে তা ভালোভাবে যাচাই করে প্রয়োজনে কেটে বা সংশোধন করে স্বাক্ষর করা উচিত। এ ক্ষেত্রে লজ্জা বা সংকোচ করা মোটেও ঠিক নয়।
১৮নং ধারাটি এমনভাবে পূরণ করা উচিত, যাতে স্ত্রী অযথা বা তাড়াহুড়ো করে তালাক গ্রহণ করতে না পারে এবং আবার স্বামীও যেন স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে আটকে রেখে জুলুম বা নির্যাতন করতে না পারে। এ জন্য অত্যন্ত সুচিন্তিত ও ভারসাম্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা প্রয়োজন। সর্বোচ্চ এক তালাকে বায়েন গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া, সেই ক্ষমতা প্রয়োগে উভয় পক্ষের এক বা একাধিক অভিভাবকের অনুমতির শর্ত আরোপ করা এবং গৎবাঁধা হালকা শর্ত পরিহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কাবিননামার সব ধারা পূরণের পরেই বরের স্বাক্ষর করা উচিত।
স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে একে অপরের অধিকার কোনোভাবেই যথাযথভাবে আদায় করা সম্ভব নয়, তাহলে প্রথমে উভয় পক্ষের অভিভাবকদের নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করতে হবে। এতে মিল সম্ভব হলে সেটিই সর্বোত্তম। কিন্তু অভিভাবকরা যদি একত্রে থাকার চেয়ে পৃথক হয়ে যাওয়াকেই শ্রেয় মনে করেন, তাহলে স্ত্রী ১৮নং ধারার ভিত্তিতে নিজের ওপর এক তালাকে বায়েন গ্রহণ করতে পারবে, স্বামী সম্মত না হলেও।
এই প্রেক্ষাপটে ১৮নং ধারাটি সংক্ষেপে এভাবে লেখা যেতে পারে: ‘হ্যাঁ, যদি উভয় পক্ষের কমপক্ষে একজন বা দুজন করে অভিভাবক শরিয়তসম্মত গ্রহণযোগ্য কারণে বিচ্ছেদের ব্যাপারে একমত হন বা লিখিতভাবে সম্মতি প্রদান করেন, তাহলে স্ত্রী অভিভাবকদের লিখিত অনুমতি সাপেক্ষে এক তালাকে বায়েনা গ্রহণ করতে পারবে।’ এভাবে শর্ত আরোপ করলে পরবর্তীতে ফতোয়া বা আইনি জটিলতার আশঙ্কা কমে যায়, ঠুনকো কারণে তালাক গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয় এবং ভবিষ্যতে পুনরায় একসঙ্গে থাকার সম্ভাবনাও অক্ষুণ্ন থাকে।
অতএব, কাবিননামা ও বিশেষ করে ১৮নং ধারা সম্পর্কে বর-কনে, অভিভাবক এবং যারা বিয়ে রেজিস্ট্রি বা বিয়ে পড়ান—সবারই সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সামান্য অসতর্কতা যেন একটি সুখী সংসার ধ্বংসের কারণ না হয়—এ বিষয়ে সকলের দায়িত্বশীল হওয়াই কাম্য।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয়