
বলিউড বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী হলেও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মুম্বাই বিস্ফোরণের ধাক্কা কাটিয়ে উঠা হিন্দি চলচ্চিত্রশিল্পে দিব্যা ভারতীর আবির্ভাব এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। তরুণ, নির্ভীক এবং অসাধারণ জনপ্রিয়—রাতারাতি তিনি রাতের তারকা হয়ে ওঠেন। কেউ কল্পনাও করেনি, এত ঝলমলে যাত্রা এত দ্রুত এবং মর্মান্তিকভাবে থেমে যাবে।
দিব্যা ভারতী বলিউডে ১৯৯২ সালে ‘বিশ্বত্মা’ ছবির মাধ্যমে অভিষেক ঘটে। কিন্তু ‘সাত সমুন্দর পার’ গানই তাঁকে ঘরে ঘরে পরিচিত করে তোলে। এরপর ‘শোলা অউর শবনম’, ‘দিওয়ানা’, ‘দিল আশনা হ্যায়’—একটির পর একটি সফল ছবিতে অভিনয় করে তিনি সময়ের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন নায়িকায় পরিণত হন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে এক বছরে ১২টির বেশি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হওয়া আজও একটি রেকর্ড। প্রযোজক, পরিচালক এবং দর্শক সকলেই তাঁর নিষ্পাপ সৌন্দর্য ও প্রাণবন্ত অভিনয়কে ভালোবেসেছিলেন।
ক্যারিয়ারের উজ্জ্বলতার আড়ালে দিব্যার ব্যক্তিগত জীবন ছিল জটিল। জানা যায়, তিনি গোপনে প্রযোজক সাজিদ নাদিয়াদওয়ালাকে বিয়ে করেছিলেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নাম বদলে রাখেন সানা। এই গোপন দাম্পত্য জীবন নানা গুঞ্জনের জন্ম দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যারিয়ারের চাপ, গোপন বিয়ের বিষয় এবং মানসিক টানাপোড়েনের কারণে তিনি ভুগছিলেন। তবে সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা সব অভিযোগই বরাবর অস্বীকার করেছেন।
১৯৯৩ সালের ৫ এপ্রিল রাতে মুম্বাইয়ের ভার্সোভা ফ্ল্যাটে ছিলেন দিব্যা ভারতী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্বামী সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা এবং ফ্যাশন ডিজাইনার নীতালুল্লা। জানা যায়, সেদিন তিনি মদ্যপান করেছিলেন এবং স্বাভাবিক আড্ডা চলছিল। একপর্যায়ে তিনি জানালার দিকে যান। ফ্ল্যাটটির জানালায় কোনো সেফটি গ্রিল ছিল না। জানালার কার্নিশে বসতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে তিনি পাঁচতলা থেকে নিচের পার্কিং এলাকায় পড়ে যান। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও পৌঁছানোর আগেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর।
এই আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে জন্ম নেয় নানা তত্ত্ব—দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, হত্যাকাণ্ড, এমনকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্পৃক্ততার গুঞ্জন। সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার বিরুদ্ধেও অভিযোগ ওঠে, কিন্তু কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুলিশের তদন্তে দেখা যায়, দিব্যার রক্তে উচ্চমাত্রার অ্যালকোহল ছিল এবং তদন্ত শেষে মৃত্যুকে দুর্ঘটনাজনিত পতন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৯৯৮ সালে প্রমাণের অভাবে মুম্বাই পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটি বন্ধ করে দেয়।
তবু রহস্য আজও কাটেনি। সেদিন রাতে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্যে অসংগতি ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ঘনিষ্ঠ গৃহপরিচারিকা অমৃতা, যিনি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন, পরবর্তী সময়ে রহস্যজনকভাবে মারা যান—যা প্রশ্নকে আরও ঘনীভূত করে।
দিব্যা ভারতীর অসমাপ্ত একাধিক ছবি পরে অন্য অভিনেত্রীদের দিয়ে শেষ করা হয়, যার মধ্যে শ্রীদেবী অভিনীত ‘লাডলা’ উল্লেখযোগ্য। আজও তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন শুধু তাঁর সৌন্দর্য ও প্রতিভার জন্য নয়, বরং মৃত্যুর আগের সেই রাত ঘিরে থাকা অমীমাংসিত রহস্যের জন্যও।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৫
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি
Leave a Reply