1. live@www.media71bd.com : Media 71 : Media 71
  2. info@www.media71bd.com : Media 71 :
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৮ পূর্বাহ্ন

শব্দতরঙ্গেই ক্যান্সারের টিউমার ধ্বংসের নতুন চিকিৎসা

হেলথ ডেস্ক
  • প্রকাশিত: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শরীরের ভেতরের ছবি দেখতে আলট্রাসাউন্ডের ব্যবহার বহুদিনের। এবার উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে শরীর না কেটে ক্যান্সারের টিউমার ধ্বংসের নতুন পদ্ধতি নিয়ে এগোচ্ছেন গবেষকরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘হিস্টোট্রিপসি’, যেখানে শব্দতরঙ্গের সাহায্যে টিউমারের টিস্যু যান্ত্রিকভাবে ভেঙে ফেলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলী জেন জু কয়েক দশক আগে শূকরের হৃদপিণ্ডের টিস্যু নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ঘটনাচক্রে এই পদ্ধতির ভিত্তি খুঁজে পান। বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

পিএইচডি শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় জু অস্ত্রোপচার ছাড়াই রোগাক্রান্ত টিস্যু ধ্বংস ও সরিয়ে ফেলার উপায় খুঁজছিলেন। এ জন্য উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ দিয়ে টিস্যু ভেঙে ফেলার ধারণা নিয়ে শূকরের হৃদপিণ্ডে পরীক্ষা চালান তিনি।

গবেষণার সময় ব্যবহৃত শক্তিশালী অ্যামপ্লিফায়ারের শব্দ নিয়ে সহকর্মীরা অভিযোগ করলে জু প্রতি সেকেন্ডে আলট্রাসাউন্ড পালসের সংখ্যা বাড়িয়ে দেন। এতে প্রতিটি পালসের দৈর্ঘ্য মাইক্রোসেকেন্ডে নেমে আসে এবং শব্দ মানুষের শ্রবণসীমার বাইরে চলে যায়।

তবে এতে অপ্রত্যাশিত ফল পান তিনি। বেশি পালসের এই পদ্ধতি জীবন্ত টিস্যুর ওপর আগের পদ্ধতির চেয়ে বেশি কার্যকর হয়। আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগের মাত্র এক মিনিটের মধ্যে শূকরের হৃদপিণ্ডের টিস্যুতে একটি গর্ত তৈরি হতে দেখেন জু।

বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলের অধ্যাপক জুয়ের সেই আবিষ্কারই হিস্টোট্রিপসির ভিত্তি। শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে অস্ত্রোপচার ছাড়াই ক্যান্সারের টিউমার ধ্বংসের সম্ভাবনাময় পদ্ধতিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

যকৃতের টিউমারে অনুমোদন

২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন যকৃতের টিউমারের চিকিৎসায় হিস্টোট্রিপসির অনুমোদন দেয়। পরের বছর জুয়ের প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য গঠিত প্রতিষ্ঠান হিসোসনিকসের অর্থায়নে একটি ছোট গবেষণায় দেখা যায়, যকৃতের টিউমারের ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে পদ্ধতিটি প্রযুক্তিগতভাবে সফল হয়েছে।

পদ্ধতিতে পেটে ব্যথা বা শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। তবে গবেষণায় এসব জটিলতা বিরল এবং পদ্ধতিটি সাধারণভাবে নিরাপদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলতি বছরের জুনে ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যও হিস্টোট্রিপসির অনুমোদন দিয়েছে। অপ্রাপ্য চিকিৎসা চাহিদার ক্ষেত্রে নতুন চিকিৎসা প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচির আওতায় দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় এই চিকিৎসা চালু হয়েছে।

স্পেনের রামন ই কাখাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ রিসার্চের ক্যান্সার গবেষক জুলি আর্ল বলেন, আলট্রাসাউন্ডকে সাধারণত শরীরের ভেতরের ছবি তৈরির প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হলেও এর ব্যবহার এখন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। টিউমার ধ্বংসের পাশাপাশি শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য ক্যান্সার চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়াতেও এটি ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

যেভাবে কাজ করে হিস্টোট্রিপসি

গর্ভাবস্থায় শিশুর ছবি দেখতে যে আলট্রাসাউন্ড ব্যবহার করা হয়, সেখানে শরীরে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ পাঠানো হয়। শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসা তরঙ্গ সেন্সর গ্রহণ করে এবং সেই তথ্য থেকে ভেতরের ছবি তৈরি করা হয়।

হিস্টোট্রিপসিতে একই ধরনের শব্দতরঙ্গ টিউমারের একটি নির্দিষ্ট ছোট অংশে কেন্দ্রীভূত করা হয়। যকৃতের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে যন্ত্রটি প্রায় দুই মিলিমিটার বাই চার মিলিমিটার এলাকার মধ্যে আলট্রাসাউন্ডের শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে পারে।

এরপর রোবোটিক বাহুর সাহায্যে টিউমারের ওপর দিয়ে আলট্রাসাউন্ডের যন্ত্র পরিচালনা করে নির্দিষ্ট স্থানে তরঙ্গ পাঠানো হয়।

খুব দ্রুত ছোট ছোট পালস আকারে আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করা হলে অতি ক্ষুদ্র ‘মাইক্রোবাবল’ তৈরি হয়। এগুলো মাইক্রোসেকেন্ডের মধ্যে ফুলে ওঠে এবং আবার চুপসে যায়। বারবার এ প্রক্রিয়া চলার ফলে টিউমারের টিস্যু ভেঙে যায়। পরে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেই অবশিষ্ট অংশ পরিষ্কার করে ফেলে।

গবেষকদের মতে, প্রক্রিয়াটি দ্রুত এবং শরীর না কেটেই করা যায়। চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী সময় পরিবর্তিত হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শেষ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে একবারের চিকিৎসাতেই টিউমার ধ্বংস করা সম্ভব হলেও বড় বা একাধিক টিউমারের ক্ষেত্রে একাধিকবার চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

এখনো রয়েছে সীমাবদ্ধতা

হিস্টোট্রিপসিকে এখনো সব ধরনের ক্যান্সারের সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে না। চিকিৎসার পর ক্যান্সার আবার ফিরে আসার বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি তথ্যও এখনো পর্যাপ্ত নয়।

শরীরের ভেতরে টিউমার ভেঙে দিলে ক্যান্সার কোষ অন্যত্র ছড়িয়ে গিয়ে নতুন টিউমার তৈরি করতে পারে কি না, তা নিয়েও কিছু গবেষকের উদ্বেগ রয়েছে। তবে প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় এখন পর্যন্ত এমন আশঙ্কার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া শরীরের সব জায়গায় হিস্টোট্রিপসি ব্যবহার করা সম্ভব নয়। হাড় আলট্রাসাউন্ডের পথ আটকে দিতে পারে। ফুসফুসের মতো গ্যাসপূর্ণ অঙ্গে এ পদ্ধতি ব্যবহার করলে আশপাশের সুস্থ টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে কিডনি ও অগ্ন্যাশয়ের টিউমারের চিকিৎসায় হিস্টোট্রিপসির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।

শব্দতরঙ্গে টিউমার পুড়িয়ে ফেলার পদ্ধতিও রয়েছে

ক্যান্সারের চিকিৎসায় আলট্রাসাউন্ডের ব্যবহার হিস্টোট্রিপসিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে থেকেই উচ্চমাত্রার কেন্দ্রীভূত আলট্রাসাউন্ড বা এইচআইএফইউ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার ফোকাসড আলট্রাসাউন্ড ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপি সেন্টারের সহপরিচালক রিচার্ড প্রাইস বলেন, এই পদ্ধতিতে টিউমারের ওপর কেন্দ্রীভূত আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে তাপ তৈরি করা হয়। সেই তাপে টিউমারের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়।

এইচআইএফইউকে আতশকাচের মাধ্যমে শুকনো পাতায় সূর্যের আলো কেন্দ্রীভূত করার সঙ্গে তুলনা করেছেন প্রাইস। তবে হিস্টোট্রিপসি ও এইচআইএফইউর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—এইচআইএফইউ তাপ তৈরি করে টিউমার ধ্বংস করে, আর হিস্টোট্রিপসি তাপ ছাড়াই যান্ত্রিকভাবে টিস্যু ভেঙে দেয়। ফলে হিস্টোট্রিপসিতে আশপাশের সুস্থ টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কম হতে পারে।

ইমিউনোথেরাপির সঙ্গেও সমন্বয়ের চেষ্টা

আলট্রাসাউন্ডের সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করার চিকিৎসা বা ইমিউনোথেরাপির সমন্বয় নিয়েও গবেষণা চলছে।

গবেষকদের ধারণা, কেন্দ্রীভূত আলট্রাসাউন্ড টিউমারকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে সেটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে। এতে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্যান্সার কোষ শনাক্ত করে আক্রমণ করতে সক্ষম হতে পারে।

রিচার্ড প্রাইসের গবেষণা কেন্দ্র এ বিষয়ে কাজ করছে। তাদের লক্ষ্য হলো, আলট্রাসাউন্ড ও ইমিউনোথেরাপির সমন্বয় উন্নত পর্যায়ের ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও কার্যকর হতে পারে কি না, তা পরীক্ষা করা।

তবে আলট্রাসাউন্ড ও ইমিউনোথেরাপির সমন্বয় এখনো গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। রোগীর চিকিৎসায় এটি কতটা কার্যকর হবে, তা জানতে আরও ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রয়োজন।

তারপরও চিকিৎসাবিজ্ঞানে আলট্রাসাউন্ডের এই নতুন ব্যবহার ক্যান্সার চিকিৎসায় সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছে। অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও বিকিরণ চিকিৎসার বিকল্প তৈরি কিংবা এসব চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানোর ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকরা।

তবে গবেষক জেন জু নিজেও হিস্টোট্রিপসিকে ক্যান্সারের ‘জাদুর চিকিৎসা’ হিসেবে দেখছেন না। অন্য চিকিৎসার মতো এরও সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি রয়েছে। বহু বছর আগে গবেষণাগারে শব্দ কমানোর একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে আবিষ্কারের সূচনা হয়েছিল, সেটিই এখন ক্যান্সার চিকিৎসায় অস্ত্রোপচারবিহীন নতুন সম্ভাবনা হিসেবে সামনে এসেছে।

সূত্র: বিবিসি

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
© ২০২৬- প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট

You cannot copy content of this page