
রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ, দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) জনগণের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের অধীন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এনবিআরের কার্যক্রমের সাফল্যের ওপর সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সফলতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই এবারের রাজস্ব সম্মেলনকে তিনি সাধারণ কোনো সম্মেলন হিসেবে দেখছেন না। তাঁর আশা, এ সম্মেলন আগামী দিনে এনবিআরের আরও সাফল্যের পথনির্দেশ করবে।
তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো এনবিআরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নীতি-নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে কাউকে পৃষ্ঠপোষকতা, কারও প্রতি বিরূপ মনোভাব এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এতে এনবিআরের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। জনগণ একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত এনবিআর প্রত্যাশা করে। বিশেষ করে করদাতারা প্রতিষ্ঠানটিকে তাদের আস্থাভাজন হিসেবে দেখতে চান। দক্ষ ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই সেই আস্থা অর্জন সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার এনবিআর তথা রাজস্ব কাঠামোকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। শুধু বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা চাপানোর নীতিতে সরকার বিশ্বাসী নয়। তাই অভ্যন্তরীণ আয় ও রাজস্বের উৎস বাড়াতে হবে।
এ জন্য উৎপাদনমুখী নীতি গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়ন বাড়বে। মানুষের আয় বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এর ফলে জনগণ আরও উন্নত সরকারি সেবা পাবে। এসব ক্ষেত্রেও এনবিআরের দক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, প্রযুক্তির বিকাশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরন পরিবর্তন এবং ব্যবসার নতুন মডেলের কারণে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে। তাই রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
তিনি বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা, বাণিজ্য অর্থায়ন, আর্থিক অপরাধ, অর্থপাচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা বিশ্লেষণের মতো বিষয়ে রাজস্ব কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। শুধু প্রচলিত কর আইন জানা যথেষ্ট নয়; অর্থনীতি, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কেও সম্যক ধারণা থাকতে হবে।
কর ব্যবস্থাকে সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে কর দিতে পারেন। কর প্রদান পদ্ধতি দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত এবং যতটা সম্ভব সহজ করতে হবে। অনলাইনে কর পরিশোধের সুযোগ থাকলে করদাতাদের অফিসে আসার প্রয়োজন হবে না।
তিনি বলেন, ‘এনবিআরকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষ এই প্রতিষ্ঠানকে ভয় করবে না—বিশ্বাস করবে।’
দেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও সক্ষমতার তুলনায় কম উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, করভিত্তিও তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ। অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক। তাই সীমিতসংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, আধুনিক কর প্রশাসনের উদ্দেশ্য শুধু বেশি কর আদায় করা নয়; বরং আরও বেশি মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা। নিয়মিত করদাতাদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মান জানাতে হবে। একই সঙ্গে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে কর এড়িয়ে চলছেন, তাদেরও যথাযথভাবে করের আওতায় আনতে হবে।
একই করদাতাদের ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির নীতি টেকসই নয় বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, কর প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিদের শনাক্ত করে যথাযথ নিয়মে তাদের করের আওতায় আনতে হবে। এ জন্য ডিজিটাল ও তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
ভ্যাট ব্যবস্থাকে আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভ্যাট প্রশাসনের জটিলতার কারণে যেন ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও এনবিআরকে নিশ্চিত করতে হবে।
রাজস্ব আহরণে এনবিআর কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক সাফল্যের প্রশংসা করে তারেক রহমান বলেন, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের পরিমাণ ইতিবাচক ছিল। এটি প্রমাণ করে, এনবিআর কর্মকর্তারা সক্ষম এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো করতে পারবেন।
তিনি বলেন, ‘আপনারা পারেন, আপনারাই পারেন এবং আপনারা অবশ্যই পারবেন, ইনশাআল্লাহ। শুধু প্রয়োজন দেশপ্রেম আর আন্তরিকতা।’
সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর উপস্থিত ছিলেন।