
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে চারটির বেশি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে। কৃষি, মৎস্য, দক্ষতা উন্নয়ন, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বেসামরিক বিমান চলাচলসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুই দেশের ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বের দিকনির্দেশনা তুলে ধরে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে আগামী ২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকে সামনে রেখে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা-সংক্রান্ত আটটি দলিল চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি চলছে। তবে আলোচনা ও প্রস্তুতির অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কতটি দলিল সই হবে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সফরকালে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলোর বেশ কয়েকটি সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারকগুলোর আওতায় কৃষি ও মৎস্য খাত, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সহযোগিতার বিষয় রয়েছে। পাশাপাশি প্রস্তাবিত যৌথ বিবৃতিতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফলাফল এবং বাংলাদেশ-জাপান কৌশলগত অংশীদারত্ব এগিয়ে নেওয়ার অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরা হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর মতে, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে জাপানের শিল্প-অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বে নতুন গতি আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলো উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত খাতগুলোতে সহযোগিতার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে পারে।
কৃষি ও মৎস্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও গুণগত মান ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী। তাঁর মতে, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোও নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ পাশাপাশি এগিয়ে নিতে হবে। এর মাধ্যমে কর্মীদের জন্য উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তিও গড়ে তোলা সম্ভব।
জাপানি বিনিয়োগের সুফল স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য। তাঁর মতে, দেশীয় সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি জাপানের মাঝারি আকারের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের অংশীদারত্ব উৎসাহিত করা উচিত। এতে উৎপাদন পদ্ধতি, মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও অর্থনৈতিক ফোরাম
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই নেতা নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী।
সফরকালে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন তারেক রহমান। এ ছাড়া জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লীগের প্রতিনিধি এবং জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকও রয়েছে।
এ ছাড়া জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
সফরসূচিতে চিবা অঞ্চলের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নাগোয়ার একটি টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্য জাপান সফর করবেন। প্রতিনিধিদল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে দেশটিতে যাবে।
ইপিএ বাস্তবায়ন ও অবকাঠামো অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা
সমঝোতা স্মারক সইয়ের পাশাপাশি চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি সই হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হবে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পথে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ জোরদার করাও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, আলোচনায় চুক্তি বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ শক্তিশালী করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও সফরে আলোচনায় আসতে পারে। এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ৮৩ শতাংশ এবং এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের ব্যয় ১১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় ও অর্থায়নের শর্ত নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধি এবং জাপানি ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে আলোচনা হবে কি না, জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা চেয়েছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অবকাঠামো সহযোগিতার বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে। তবে আলোচনা শুধু মেট্রোরেল প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সব দেশ থেকেই কম সুদে ঋণ পেতে চায়। বৈশ্বিক অর্থায়নব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিভিন্ন বিষয় আলোচনার ফলাফলকে প্রভাবিত করবে।
বাংলাদেশে মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী অবকাঠামো উন্নয়নসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পে সহায়তা করছে জাপান। ২০১৪ সালে চালু হওয়া ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ অবকাঠামো, শিল্প ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুও আলোচনায় থাকবে
সফরে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও দুই দেশের নেতাদের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয় রয়েছে।
দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে নতুন সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলা, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্বকে আরও এগিয়ে নেওয়াই এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য।