
মন্দিরের আঙিনায় টিনের একচালা ঘর। নেই আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, চেয়ার-টেবিল কিংবা বেঞ্চ। নেই বেতনভুক্ত কোনো শিক্ষকও। অথচ এই সাধারণ পরিবেশেই প্রায় ছয় দশক ধরে শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাংতা গ্রামের অশীতিপর রমণী কান্ত বেপারী। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি যে পাঠদানের যাত্রা শুরু করেছিলেন, বয়সের ভারেও তাতে ছেদ পড়েনি। তাঁর কাছে বিনা মূল্যে পড়াশোনা করেছে গ্রামের তিন প্রজন্মের শিশু। শিক্ষা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এবার রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে সম্প্রতি ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর গলায় সম্মাননা পদক পরিয়ে দেন। এ সময় তাঁকে দুই লাখ টাকার চেক ও সম্মাননা সনদও দেওয়া হয়।
স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, সবার প্রিয় ‘রমণী স্যার’। প্রত্যন্ত রাংতা গ্রামের শিশুদের কাছে এই নামেই পরিচিত তিনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর কাছে হাতেখড়ি নিয়েছে। বয়স ৭০ পেরিয়ে গেলেও শিশুদের পড়ানোর প্রতি তাঁর আগ্রহে ভাটা পড়েনি।
রমণী কান্ত বেপারী নিজে যখন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তখন থেকেই এলাকার দরিদ্র শিশুদের পড়ানো শুরু করেন। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের পাঠদানের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা আজও অব্যাহত রেখেছেন তিনি। সময়ের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা ও গ্রামের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এলেও রাংতা গ্রামের এই ছোট্ট পাঠশালায় প্রতিদিনই শোনা যায় শিশুদের কলকাকলি।
১৯৭৩ সালে চাঁদশী ঈশ্বর চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন রমণী কান্ত। এরপর সরকারি গৌরনদী কলেজে ভর্তি হলেও পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষ করা সম্ভব হয়নি তাঁর।
মেধাবী শিক্ষার্থী হওয়ায় সে সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। তবে সেই সুযোগ গ্রহণ না করে গ্রামের শিশুদের পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। শিশুদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই পাঠদানকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন এই শিক্ষক।
রাজিহার-চাঁদশী সড়কের পাশে রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের আঙিনায় গড়ে উঠেছে তাঁর পাঠশালা। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘রমণী কান্তের পাঠশালা’ নামে পরিচিত। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলে পাঠদান।
এই পাঠশালায় শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মাসিক বেতন নেই। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিশুরা যেন অর্থের অভাবে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটিই রমণী কান্তের মূল লক্ষ্য। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও বছরের পর বছর শিশুদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
রমণী কান্তের ব্যক্তিগত জীবনও অত্যন্ত সাধারণ। স্ত্রী রুম্পা বেপারীকে নিয়ে একটি দোচালা টিনের ঘরে বসবাস করেন তিনি। একমাত্র ছেলে তাপস বেপারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তাঁর সামান্য কিছু কৃষিজমিও রয়েছে।
অভাব-অনটনের মধ্যেও শিশুদের পড়ানোর আনন্দকেই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন রমণী কান্ত। দীর্ঘদিনের এই পথচলায় ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চেয়ে গ্রামের শিশুদের শিক্ষিত করে তোলাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে রমণী কান্ত বেপারী বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকেই তিনি এখানে বসে এলাকার শিশুদের পাঠদান করে আসছেন। যত দিন বেঁচে থাকবেন, এভাবেই শিশুদের মধ্যে শিক্ষা বিলিয়ে যেতে চান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে সম্মাননা পাওয়াকে শিক্ষকজীবনের সার্থকতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জীবনের বাকি সময়টুকুও মন্দির প্রাঙ্গণে শিশুদের শিক্ষা দিয়ে কাটিয়ে দিতে চান।
আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার বলেন, রমণী কান্তের পাঠশালায় শিশুদের পাঠদান পদ্ধতি দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। তাঁর মতো ভালো মানুষ সমাজে আছেন বলেই দেশটা এত সুন্দর বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রায় ছয় দশক ধরে বিনা মূল্যে শিশুদের শিক্ষা দিয়ে রমণী কান্ত বেপারী দেখিয়েছেন, শিক্ষকতা শুধু জীবিকা অর্জনের পেশা নয়; এটি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা ও সমাজ গঠনের এক অনন্য অঙ্গীকার। তাঁর ছোট্ট পাঠশালা তাই কেবল পড়াশোনার জায়গা নয়, বরং রাংতা গ্রামের কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি, ভালোবাসা ও শিক্ষার এক নির্ভরতার ঠিকানা।