
বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এবং দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন তাঁরা। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত বাংলাদেশে জাপানি প্রতিনিধি দল পাঠানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের রাজধানী টোকিওতে দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত ১৪ দফা যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে জ্বালানি, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। পরে তিনি মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন এবং জাপানের একটি এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত হোসেন স্বাধীন জানান, বৈঠকে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শিল্পায়নের লক্ষ্য অর্জনে জাপান সরকার এবং দেশটির বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈঠকে আগামী পাঁচ বছরে জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত বাংলাদেশে একটি জাপানি প্রতিনিধি দল পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের বিশেষ স্থান রয়েছে। এ সময় তিনি তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুবার জাপান সফর এবং তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক জোরদারে অবদানের কথা স্মরণ করেন।
সফরকালে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির জনগণকে ধন্যবাদ জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি সুবিধাজনক সময়ে সানায়ে তাকাইচিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। এ ক্ষেত্রে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি এশিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় সাম্প্রতিক ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের কথা উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি স্বাগত জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান তিনি।
পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি বিবেচনায় দুই প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ‘বিগ-বি’কে উন্নীত করে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এ উদ্যোগের আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি ও শিল্পের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া, ঢাকার মেট্রোরেল লাইনগুলোর নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করা এবং মাতারবাড়ী বন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করতে একমত হয়েছে দুই দেশ।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের মসৃণ ও টেকসই উত্তরণে সহায়তার লক্ষ্যে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের আগ্রহের বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনার আশ্বাস দিয়েছে জাপান।
দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরবিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষর ও কার্যকর হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই দেশের নেতা।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রশংসা করে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সমুদ্র ও বন্দর নিরাপত্তায় সহযোগিতা গভীর করার প্রতিশ্রুতি দেন। বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তার আওতায় একটি বড় টহল জাহাজ এবং নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি টহল নৌযান দেওয়ার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানান দুই প্রধানমন্ত্রী।
স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ‘উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’-এর দ্বিতীয় পর্যায়ে ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনে জাপানের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তারেক রহমান। বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশাও জানান তিনি।
একটি অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্ব্যক্ত করেন দুই নেতা। আঞ্চলিক যোগাযোগ, অবাধ বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।
যৌথ বিবৃতিতে মিয়ানমারের অবনতিশীল পরিস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, নির্বিঘ্নে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
ফিলিস্তিনের গাজা পুনর্গঠনে সমন্বিত পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে ফিলিস্তিন সংকটের ন্যায্য ও স্থায়ী সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দ্রুত ও পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তাঁরা।
বৈঠকের সমাপনী বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি এ শীর্ষ বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। গভীর আস্থা, বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী বিনিয়োগ সম্পর্ক এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে এ সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত হোসেন স্বাধীন জানান, মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে জেরার (জেডইআরএ) স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন তারেক রহমান। এ ছাড়া তিনি জাপানের নিতসু লজিস্টিকস হাবও পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া সফরসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।