
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের উদ্যোগে অ-নথিভুক্ত বাংলাদেশি অভিবাসী শনাক্ত ও প্রত্যর্পণ কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে উদ্বেগ বাড়ছে। এই অভিযানের ফলে বহু বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্ত চেকপোস্ট ও অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টারে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সীমান্তঘেঁষা হাকিমপুর এলাকায় এমন বহু পরিবারের দেখা মিলছে, যারা বছরের পর বছর ভারতে বসবাস ও কাজ করার পর বর্তমানে দেশে ফেরার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন। তাদের অনেকেই উন্নত জীবিকা, চিকিৎসা কিংবা অর্থনৈতিক কারণে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন।
সাতক্ষীরা জেলার বাসিন্দা রইসুল ইসলাম ও তার পরিবারের মতো অনেকেই দাবি করেছেন, অর্থনৈতিক সংকট ও উন্নত আয়ের আশায় তারা ভারতে গিয়েছিলেন। সেখানে নির্মাণশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। তবে পশ্চিমবঙ্গে নতুন প্রশাসনিক নীতিমালা কার্যকরের পর তাদের অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও অনেক অভিবাসী। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মসংস্থান ও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য তারা ভারতে অবস্থান করছিলেন। সাম্প্রতিক অভিযানের কারণে অনেকেই স্বেচ্ছায় প্রশাসনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন কিংবা সীমান্ত এলাকায় ফিরে এসেছেন।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার বলছে, অ-নথিভুক্ত বিদেশি নাগরিকদের শনাক্তকরণ ও প্রত্যর্পণ দেশের প্রচলিত আইনের অংশ। রাজ্য প্রশাসনের দাবি, ইতোমধ্যে কয়েক হাজার ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করা হয়েছে এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তাদের প্রত্যর্পণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সরকার আরও জানিয়েছে, বিভিন্ন জেলায় অস্থায়ী আটক বা হোল্ডিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে পরিচয় যাচাই ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
এই ইস্যুতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিবাসীদের জাতীয়তা যাচাই ও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যেকোনো প্রত্যাবাসন কার্যক্রম আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক নিয়ম মেনেই হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে তাদের নিজস্ব আইন ও বাংলাদেশ-ভারতের বিদ্যমান সমঝোতা অনুসারেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জাতীয়তা যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পরই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয় বলে তারা জানিয়েছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অভিবাসীদের আইনি সহায়তা ও যথাযথ শুনানির সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, পরিচয় যাচাই ও প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং কোনো নাগরিক যেন ভুলবশত ক্ষতিগ্রস্ত না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত, অভিবাসন ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়গুলো দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিনের একটি জটিল বাস্তবতা। ফলে মানবিক দিক, আইনগত প্রক্রিয়া এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
হাকিমপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বর্তমানে অনেক পরিবার পরিচয় যাচাই ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। তাদের অধিকাংশই ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। কেউ দেশে ফিরে নতুনভাবে জীবন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আবার কেউ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগের অপেক্ষায় আছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন ইস্যুটি শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি মানবিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। তাই এ বিষয়ে গৃহীত যেকোনো পদক্ষেপ আঞ্চলিক সম্পর্ক ও সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।