
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার ওপরই দাম্পত্য জীবনের সুখ অনেকাংশে নির্ভর করে। একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও সহানুভূতি যত গভীর হয়, দুজনের সম্পর্কও তত দৃঢ় হয়। বিপরীতে, ভালোবাসার জায়গায় যখন অবিশ্বাস ও অমূলক সন্দেহ জায়গা করে নেয়, তখন সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হয় দূরত্ব। ধীরে ধীরে তা দাম্পত্য কলহ, মানসিক অশান্তি এবং পারিবারিক ভাঙনের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে মানুষের যোগাযোগের পরিধি বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় ও যোগাযোগ সহজ হয়েছে। তবে এর সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ, অস্বস্তি ও ভুল বোঝাবুঝিও তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অকারণ সন্দেহ দাম্পত্য জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসলাম মানুষের প্রতি অযথা কুধারণা পোষণ করতে নিরুৎসাহিত করেছে। প্রমাণ ছাড়া কারও সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা করা ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে বিরূপ মনোভাব তৈরি করতে পারে। এর ফলে পারস্পরিক আস্থা ও সম্প্রীতি নষ্ট হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যারা বিনা অপরাধে ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহজাব: ৫৮)।
ইসলামে মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় অনুসন্ধান করা, দোষ খুঁজে বেড়ানো এবং পেছনে সমালোচনা করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রমাণ ছাড়া কারও ব্যাপারে ধারণা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মোমিন! তোমরা অন্যের ব্যাপারে অধিকাংশ অনুমান করা থেকে বিরত থাক। ধারণা করা অনেক ক্ষেত্রেই গোনাহের কাজ। তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় খুঁজে বেড়িও না। কারও অনুপস্থিতিতে তার নিন্দা কর না।’ (সুরা হুজুরাত: ১২)।
এই আয়াতে মানুষের গোপনীয়তা অনুসন্ধান ও অমূলক সন্দেহের নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্দেহপ্রবণতা থেকে সতর্ক করেছেন। হাদিসে এসেছে, ‘সাবধান! তোমরা সন্দেহ করা থেকে বিরত থাক। কারণ, সন্দেহ হচ্ছে সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার। পরস্পরের বিরুদ্ধে তথ্য তালাশ কর না এবং গোয়েন্দাগিরি কর না।’ (বোখারি: ৪৯১৭)।
অর্থাৎ, কোনো প্রমাণ ছাড়াই শুধু ধারণার ওপর ভিত্তি করে স্বামী বা স্ত্রীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
বর্তমানে অনেক দম্পতির মধ্যে একে অপরের মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা মেসেজিং অ্যাপের ব্যক্তিগত তথ্য গোপনে যাচাই করার প্রবণতা দেখা যায়। অনেক সময় এর পেছনে থাকে সন্দেহ বা অবিশ্বাস। এ ধরনের আচরণ সম্পর্কের পারস্পরিক আস্থা দুর্বল করতে পারে এবং ছোট বিষয়কে বড় দ্বন্দ্বে পরিণত করতে পারে।
হাদিসে সফর থেকে ফিরে রাতে অতর্কিতে ঘরে প্রবেশের বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সফর থেকে ফিরে স্ত্রীর প্রতি সন্দেহবশত বা তার ওপর গোয়েন্দাগিরির উদ্দেশ্যে রাতের বেলা অতর্কিতে ঘরে যেতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম: ৪৮১৬)।
স্বামী বা স্ত্রীর কোনো প্রকাশ্য সন্দেহজনক আচরণ না থাকলে শুধু অনুমান বা ধারণার ভিত্তিতে তাকে সন্দেহ করা উচিত নয়। বরং প্রকাশ্য কথা ও আচরণের ভিত্তিতে পরস্পরের সঙ্গে ভালো আচরণ করা এবং গোপন বিষয় আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াই উত্তম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মনে যেসব কথা আসে, আল্লাহ তা মাফ করে দিয়েছেন যে পর্যন্ত না সে অনুযায়ী কোনো কাজ করে বা মুখে উচ্চারণ করে।’ (বোখারি: ৬৬৬৪)।
এ থেকে বোঝা যায়, মনে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ধারণা আসা এবং সেটিকে ভিত্তি করে বাস্তবে অন্যায় আচরণ করা এক বিষয় নয়। তাই সন্দেহকে যাচাইহীন অভিযোগ বা অন্যায় আচরণে পরিণত না করাই গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামে শুধু মানুষের প্রতিই নয়, আল্লাহর প্রতিও সুধারণা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমার প্রতি বান্দার যে ধারণা, আমি সে ধারণার কাছে থাকি।’ (বোখারি: ৭৪০৫; মুসলিম: ২৬৭৫)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকালের তিন দিন আগে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের মৃত্যু যেন এ অবস্থায় হয় যে, সে আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করেছে।’ (মুসলিম: ২৭৮৮)।
পবিত্র কোরআনে জ্ঞান ও প্রমাণ ছাড়া কোনো বিষয়ে অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করা হয়েছে।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হয়ো না। নিশ্চয় কান-চোখ ও হৃদয়ের প্রতিটির কাছে কৈফিয়ত তলব করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৩৬)।
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যে বিষয়ে তাদের কোনো জ্ঞান নেই, তারা শুধু ধারণা-অনুমানের অনুসরণ করে, আর সত্যের মোকাবেলায় ধারণা-অনুমান কোনো কাজে আসবে না।’ (সুরা নাজম: ২৮)।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু ভালোবাসার ওপর নয়, পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের ওপরও প্রতিষ্ঠিত। তাই অমূলক সন্দেহ, গোপনে অনুসন্ধান, দোষ খোঁজা কিংবা প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ সম্পর্ককে দুর্বল করে দিতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক। কারণ, ধারণাভিত্তিক কথাই হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা। তোমরা একে অপরের দোষ অনুসন্ধান করো না। পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও দুশমনি কর না; বরং পরস্পর ভাই হয়ে যাও হে আল্লাহর বান্দারা!’ (বোখারি: ৪৮৪৯)।
তাই দাম্পত্য জীবনে কোনো বিষয় নিয়ে সন্দেহ বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলে অমূলক ধারণার ওপর নির্ভর না করে পারস্পরিক আলোচনা, ধৈর্য ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। বিশ্বাস ও সম্মান বজায় থাকলে পারিবারিক সম্পর্কও আরও দৃঢ় ও শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।