
বাংলাদেশের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে খেলছেন। এরই মধ্যে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকার তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলে দেশে ফিরতে প্রস্তুত তিনি। একই সঙ্গে হত্যা মামলাসহ তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে এবং দেশের মাটিতে বিদায়ী সিরিজ খেলতে চান এই ক্রিকেটার।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে সাকিব যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে এখনো অবসর না নেওয়া ৩৯ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার জানিয়েছেন, তিনি দেশের মাটিতে বিদায়ী সিরিজ খেলতে চান। পাশাপাশি ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
শ্রীলঙ্কায় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলার সময় ফোনে রয়টার্সকে সাকিব বলেন, সরকার তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে তিনি দেশে ফিরে আদালতের বিচার ও প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।
নিজের প্রায় দুই বছরের প্রবাসজীবন প্রসঙ্গে সাকিব বলেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি বলে বিশ্বাস করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় করা মামলায় অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারা ডিসেম্বর মাসে স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।
সাকিব জানান, তিনি অবিলম্বে দেশে ফিরতে চান। তা সম্ভব না হলে শেখ হাসিনার সঙ্গেই দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে সাকিব বলেন, অধিনায়ক যা বলেন, তারা সেটিই অনুসরণ করেন এবং সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে সেরা সিদ্ধান্ত নেবেন বলে তিনি মনে করেন।
এর আগে দিল্লিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও সাকিব সমর্থন করেছিলেন। ওই সংবাদ সম্মেলনের পর মাগুরায় তার বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সাকিব বলেন, তিনি ওই অনুষ্ঠানে শুধু শান্তি ও বাংলাদেশের অগ্রগতির আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং এ নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই।
সাকিব জানান, তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র, আইন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের কাছে আইনজীবীর মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে করা ‘মনগড়া মামলা’ প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন। তবে কোনো জবাব পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
দেশে ফেরার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও কথা বলতে আগ্রহী বলে জানান সাকিব। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্ররা রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্রিকেট ক্যারিয়ার প্রসঙ্গে সাকিব জানান, অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে তিনি খুব বেশি সময় অপেক্ষা করবেন না। বর্তমানে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলছেন এবং শারীরিকভাবে ভালো বোধ করছেন বলেও জানান তিনি।
তবে বয়সের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে খুব বেশি দিন ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন সাকিব।
সাকিব জানান, ২০২৪ সালের শেষ দিকে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাওয়ার পর তিনি দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে বিমানে উঠেছিলেন। বিমানবন্দরের লাউঞ্জ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিজের ভ্রমণের বিষয়টি জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে যাত্রাপথে তাকে ফিরে যেতে বলা হয়। পরে তিনি দুবাইয়ে নেমে পরিবারের কাছে নিউইয়র্কে ফিরে যান।
সাকিবের ভাষ্য, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কী পরিবর্তন হয়েছিল, তা তিনি জানেন না।
পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার কারণেও দেশে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা থেকে দূরত্ব বজায় রাখলে দেশে ফেরা সহজ হতে পারে—এমন পরামর্শ পেয়েছিলেন বলেও জানান সাকিব। তবে তিনি সেই পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সাকিব জানান, বর্তমানে তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে একটি ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় এক আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার ঘটনায় করা হত্যা মামলা এবং অন্যটি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলা।
হত্যা মামলাটিকে ‘হাস্যকর মামলা’ হিসেবে উল্লেখ করে সাকিব বলেন, মামলাটি দায়েরের দিন তিনি টরন্টোতে একটি ম্যাচ খেলছিলেন। তিনি জানান, এখনো ওই মামলায় কোনো আইনজীবী নিয়োগ করেননি।
এ ছাড়া প্রায় দেড় বছর ধরে তার ব্যাংক হিসাব স্থগিত রয়েছে বলেও দাবি করেন সাকিব। তার ভাষ্য, গত ১০ বছর ধরে তিনি সর্বোচ্চ করদাতাদের একজন এবং নিয়মিত কর পরিশোধ করেছেন। তদন্তের প্রয়োজন হলে প্রয়োজনীয় সব তথ্য দিতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
সাকিব আরও জানান, প্রায় দুই বছর ধরে তিনি বাংলাদেশে থাকা মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না। তাদের দেশের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
সাকিব বলেন, পরিস্থিতিটি তাদের সবার জন্য কঠিন ছিল। তবে তারা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টিকে আছেন।