1. live@www.media71bd.com : Media 71 : Media 71
  2. info@www.media71bd.com : Media 71 :
মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন

অর্থনীতির ৩১ সূচকের ১৯টিতেই অবনতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পার হলেও দেশের অর্থনীতি প্রত্যাশিত গতিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সামষ্টিক সূচকের মধ্যে ১৯টিতে অবনতি হয়েছে। বিপরীতে ১২টি সূচকে অগ্রগতি হয়েছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে সিপিডির আয়োজনে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।

সিপিডির পর্যালোচনায় অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে রাজস্ব আদায়। চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এই ঘাটতি বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৯ থেকে ২০ শতাংশ।

একই সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধিও ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

রাজস্ব সংকটের পাশাপাশি সরকারের ব্যাংকনির্ভরতাও বেড়েছে। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে নিট বৈদেশিক সহায়তা ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

শিল্প খাতের পরিস্থিতিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন।

এ সময়ে শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে শূন্যে এবং উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমেছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।

বিনিয়োগেও মন্দাভাব দেখা গেছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে নেমে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।

এদিকে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহ ও কার্গো গ্রহণে জটিলতার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এতে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানায় সিপিডি।

তবে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তির চিত্র পাওয়া গেছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে ৭ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনও নেতিবাচক। ফলে মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বাণিজ্য খাতেও মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। রফতানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। তবে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে।

এর ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি হিসাবের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্তও ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর সিদ্ধান্তে দেরি নিয়েও সতর্ক করেছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, বেতন-ভাতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত যত দেরি হবে, সমস্যা তত বাড়বে। বিষয়টি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে না রেখে দ্রুত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার যে বেতন কাঠামোর প্রতিবেদন দিয়ে গেছে, সেটি মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ ছিল। শুরুতেই ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করে পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ কাঠামো কার্যকর করা যেত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা পেয়েছে। একই সময়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। তবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে সরকার একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করেনি।

এ কারণে সরকার কোন পরিস্থিতি থেকে দায়িত্ব নিয়েছিল এবং ছয় মাসে অর্থনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন তিনি।

দেবপ্রিয় বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রধান প্রত্যাশার মধ্যে ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা থাকলেও ছয় মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনায় এসব ক্ষেত্রে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

সংস্কার কর্মসূচিতেও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে এখনও একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা স্পষ্ট নয় বলেও জানান তিনি। ইশতেহারে যেসব কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোরও অনেকগুলো বাস্তবায়িত হয়নি বলে উল্লেখ করেন দেবপ্রিয়।

সরকারের প্রতিশ্রুতি ও গৃহীত পদক্ষেপ মূল্যায়নে সিপিডি প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপের তালিকা করেছে। এসব পদক্ষেপকে ৯টি ভাগে ভাগ করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা পর্যালোচনায় রাখা হয়েছে। সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগের মতো কিছু পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন দেবপ্রিয়। তবে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগের মতো কিছু বিষয় উদ্বেগ তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের একটি ‘কোর বাজেট’ তৈরির সুপারিশ করেছে সিপিডি। পাশাপাশি জ্বালানি, ব্যাংকিং খাত, এনবিআর, রাজস্ব-ব্যয়, এডিপি, লজিস্টিকস, ডিজিটালাইজেশন ও বেতন কমিশনকে নিয়ে সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সেপ্টেম্বরের মধ্যেই সংসদে বেতন কাঠামো, ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© ২০২৬- প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট

You cannot copy content of this page