
আগামী ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। চুক্তিটি নবায়ন বা নতুন করে চুক্তি করতে কয়েক মাস আগে ঢাকার পক্ষ থেকে দিল্লিকে আলোচনা শুরুর বার্তা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত ভারতের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া যায়নি।
তবে ভারত বিষয়টি যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) আওতায় আলোচনা করছে বলে গত ২১ আগস্ট জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন নিয়ে অচলাবস্থা কাটলে দুই দেশের সম্পর্কেও নতুন গতি আসতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সই করে। সেই হিসাবে চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হবে। চুক্তি নবায়ন কিংবা নতুন চুক্তি করতে হলে দুই দেশের পারস্পরিক সম্মতি প্রয়োজন।
চুক্তিটির মূল বিষয় হলো, ফারাক্কা ব্যারাজে শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত গঙ্গার পানি বণ্টন। পানি প্রবাহ ১০ দিন পরপর হিসাব করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে, বিশেষ করে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত, উভয় দেশকে পর্যায়ক্রমে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদী রয়েছে ৫৪টি। এর মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টনই একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় রয়েছে।
চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চলছে। গত মার্চ ও মে মাসে কলকাতায় উভয় দেশের কারিগরি কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে ফারাক্কা ব্যারাজে যৌথভাবে পানি প্রবাহ পরিমাপ করা হয়। তবে রাজনৈতিক পর্যায়ে সমঝোতা না হলে চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
ঢাকার পক্ষ থেকে গত জুন মাসে চুক্তি নবায়নের বিষয়ে দিল্লিকে আলোচনা শুরুর বার্তা দেওয়া হলেও ভারত এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সাড়া দেয়নি। দিল্লি বিষয়টি আপাতত যৌথ নদী কমিশন পর্যায়েই রাখতে চাইছে।
চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ১৯৯৬ সালের তুলনায় বর্তমান পানিপ্রবাহ ও বাস্তবতার পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আগের পরিস্থিতি এখন আর নেই। এ কারণে বাংলাদেশ চায়, নতুন চুক্তিটি আরও দীর্ঘমেয়াদি করার পাশাপাশি পানির নিশ্চয়তা দিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ যুক্ত করা হোক।
অন্যদিকে, পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় ভারতও নতুন বা সংশোধিত চুক্তির কথা ভাবছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত ২১ আগস্ট দিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৯৬ সালে ৩০ বছরের জন্য গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ভারত ও বাংলাদেশের নদীসংক্রান্ত সব বিষয় যৌথ নদী কমিশনের অধীনে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির আওতায় গঠিত কমিটির বৈঠকও কারিগরি পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে জানান, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনার জন্য বাংলাদেশ একটি নতুন দল গঠন করেছে। বিষয়টি ভারতীয় কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে এবং সরকার এখন ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মো. আনোয়ার কাদির বলেন, গঙ্গা চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ভারতের চার সদস্যের দুটি দলের উপস্থিতিতে প্রতিদিন চারবার গঙ্গার পানি পরিমাপ করা হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর শেষ হলেও নবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো শুরু হয়নি।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম এবং কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম মনিরুল কাদের মির্জা এক যৌথ বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ রাখা হয়নি।
আন্তর্জাতিক পানি বিশেষজ্ঞ ও যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য মালিক ফিদা এ খান বলেন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়ন নিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। ৩০ বছর আগের বাস্তবতা এবং বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। তাই নবায়নের সময় চুক্তিটি নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি।
তিনি বলেন, নতুন চুক্তিতে নদীর প্রতিবেশব্যবস্থা ও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশগত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পানি সংরক্ষণের জন্য গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
পানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. এম মনোয়ার হোসেন বলেন, ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ না থাকায় নবায়নের সময় তা যুক্ত করা প্রয়োজন। শুধু পানির পরিমাণ ভাগাভাগি করলেই হবে না, পানির সঙ্গে আসা পলি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও চুক্তিতে থাকা দরকার।
তিনি আরও বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের পানি চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংককে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন চুক্তিতেও এ ধরনের একটি মধ্যস্থতাকারী রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেন, নতুন চুক্তির আলোচনা শুরুর আগেই জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক জলপথ কনভেনশন অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। তার মতে, এই কনভেনশন উজানের রাষ্ট্রের পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভাটির দেশের পানির অধিকার ক্ষুণ্ন না করার নীতিকে গুরুত্ব দেয়।
তিনি বলেন, গঙ্গার পানি ভাগাভাগির চুক্তি করা সম্ভব হলেও তা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা যথেষ্ট ছিল না। এ কারণে চুক্তি লঙ্ঘন বা অভিযোগের বিষয় প্রায়ই সামনে এসেছে।
ম. ইনামুল হকের মতে, নদীর পানি বণ্টন শুধু নির্দিষ্ট পরিমাণের ভিত্তিতে না করে নদীর প্রবাহ ও সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রয়োজনের ভিত্তিতেও বিবেচনা করা উচিত। ঐতিহাসিক প্রবাহের তথ্য থাকলেও উজানে পানির ব্যবহার বাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাহ কমে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গঙ্গার নিম্ন অববাহিকার নির্ভরশীল এলাকা ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে দ্বিগুণেরও বেশি। যেহেতু দুই দেশের নিম্ন অববাহিকাই একই বাংলার সমভূমির অংশ, তাই গঙ্গার পানি দুই বাংলার মানুষের অভিন্ন স্বার্থের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
তার প্রস্তাব, নতুন চুক্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণের পরিবর্তে উজান থেকে আসা পানির প্রবাহের ২০ থেকে ৩০ শতাংশের বেশি সবসময় ডাইভার্ট না করার বিধান রাখা যেতে পারে। বাংলাদেশের পানি কূটনীতিতেও বিষয়টিকে সীমান্তের দুই পাশের মানুষের অভিন্ন স্বার্থ হিসেবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।