
সমান মর্যাদার ভিত্তিতে যেকোনো সংলাপ ও কূটনৈতিক আলোচনায় বসতে ইরান প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে কোনো ধরনের শক্তি, হুমকি বা চাপের কাছে তেহরান নতি স্বীকার করবে না বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইরান আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি; তবে সেই আলোচনা হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে।
ভাষণের শুরুতে পেজেশকিয়ান ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবে একটি স্কুলে হামলায় নিহত শিক্ষার্থীদের ছবি প্রদর্শন করেন। পাশাপাশি তিনি সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামেনি ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন—এমন দাবি পেজেশকিয়ান তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ও হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেই সেটিকে সন্ত্রাসবাদ বা আঞ্চলিক অনিরাপত্তা সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ইরানকে চাপ ও হুমকির মাধ্যমে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকে ধ্বংস করার হুমকির প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। পেজেশকিয়ান বলেন, এ ধরনের হুমকি ইরানি জনগণকে আরও ঐক্যবদ্ধ করছে। তিনি বলেন, ইরান কখনো যুদ্ধ শুরু করেনি এবং বরাবরই আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজেছে।
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ইরান কোনোভাবেই মাথা নত করবে না বা হাঁটু গেড়ে বসবে না। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আলোচনার মাধ্যমে আঞ্চলিক সংকট সমাধানের আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান দুর্বলতার কারণে নয়, নিজেদের সক্ষমতা ও দৃঢ়তার জায়গা থেকেই বিশ্বের সঙ্গে সহযোগিতায় আগ্রহী।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়েও সতর্কবার্তা দেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, এই অঞ্চলের কোনো দেশ এককভাবে নিরাপদ থাকতে পারবে না। সবাই মিলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে পুরো অঞ্চলকেই অনিরাপত্তার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে না। তবে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও শান্তিপূর্ণ প্রযুক্তি থেকে তেহরান সরে যাবে না। শান্তিপূর্ণ বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য পরিচালিত পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তিনি ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিদর্শন ও জবাবদিহির প্রশ্ন তুললেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারির বিষয়টি তুলে ধরেন।
এর আগে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধকে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানোর সঙ্গে যুক্ত করেন এবং তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তির সম্ভাবনার কথা বলেন। এর পরদিন পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির কঠোর প্রতিবাদ এবং অন্যদিকে সমমর্যাদার ভিত্তিতে কূটনৈতিক আলোচনার আগ্রহ—দুই বিষয়ই উঠে আসে।
জাতিসংঘের অধিবেশনের পাশাপাশি নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনাও হয়েছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের অবসান, নিষেধাজ্ঞা, ইরানের সম্পদ এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।