দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র রমজান। মোমিনের জীবনে রমজান এক আধ্যাত্মিক বসন্ত—তবে এই বসন্তের পূর্ণ ফসল পেতে হলে প্রস্তুতি শুরু করতে হয় আগেভাগেই। প্রখ্যাত তাবেয়ি আবু বকর আল-ওয়াররাক (রহ.) বলেছেন, “রজব মাস বীজ বোনার মাস, শাবান মাস ফসলে পানি দেওয়ার মাস আর রমজান হলো ফসল কাটার মাস।” তাই রমজানের পরিপূর্ণ বরকত লাভের জন্য শাবান মাস থেকেই প্রস্তুত হওয়া জরুরি। রমজানের প্রস্তুতির ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো—
১. তওবা ও সংকল্পের শুদ্ধতা
রমজানের ইবাদতে মন বসাতে হলে আগে অন্তরকে গোনাহমুক্ত করতে হবে। অতীতের ভুলত্রুটির জন্য আন্তরিক তওবা করে নতুন জীবনের সংকল্প নিন। কোরআনে ইরশাদ: “হে মোমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর—যাতে সফলকাম হও।” (সুরা নূর: ৩১)
২. শাবানের রোজা ও নববি আদর্শ
শাবানে বেশি বেশি নফল রোজা রমজানের দীর্ঘ সিয়ামের প্রস্তুতি দেয়। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবানে অন্য মাসের তুলনায় বেশি রোজা রাখতেন (বোখারি: ১৯৬৯)। তবে শারীরিক দুর্বলতা থাকলে শেষার্ধে রোজা না রেখে শক্তি সঞ্চয় করা যেতে পারে।
৩. কোরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস
শাবান ‘শাহরুল কুররা’—কারিদের মাস। রমজানে খতমের লক্ষ্য থাকলে এখন থেকেই নিয়মিত তেলাওয়াত শুরু করুন। প্রতিদিন অন্তত ১–২ পারা পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৪. বকেয়া রোজা আদায়
পূর্ববর্তী রমজানের কাজা রোজা থাকলে শাবানেই আদায় করা আবশ্যক। আয়েশা (রা.) শাবানেই বকেয়া রোজা আদায় করতেন।
৫. হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত অন্তর
শাবানের মধ্যরজনীতে আল্লাহ সবাইকে ক্ষমা করেন—বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত। মনোমালিন্য মিটিয়ে অন্তরকে স্বচ্ছ করুন।
৬. কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদ) প্রস্তুতি
শাবান থেকেই শেষ রাতে অন্তত ২ রাকাত নফল নামাজের অভ্যাস গড়ুন—রমজানে তারাবি ও দীর্ঘ ইবাদত সহজ হবে।
৭. অপ্রয়োজনীয় আসক্তি বর্জন
সোশ্যাল মিডিয়া ও অনর্থক আড্ডা কমান। স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে আনলে রমজানের মূল্যবান সময় বাঁচবে।
৮. আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করা
আত্মীয়দের খোঁজ নিন, অসচ্ছলদের পাশে দাঁড়ান। রাসুল (সা.) বলেছেন, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না (বোখারি: ৫৯৮৪)।
৯. পরিমিত আহার ও নিদ্রা
ভূরিভোজ কমিয়ে রসনা নিয়ন্ত্রণ করুন। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পর্যাপ্ত ঘুম ইবাদতে প্রাণবন্ত রাখে।
১০. জিকির ও দোয়ায় অভ্যস্ততা
ইস্তিগফার, তসবি ও অর্থবহ দোয়াগুলো মুখস্থ করুন—রমজানের মোনাজাতে তা সহায়ক হবে।
১১. দান-সদকার মহড়া
শাবান থেকেই দানে অভ্যস্ত হোন। রমজানে রাসুল (সা.) ছিলেন অতিশয় দানশীল—এই সুন্নাহ গড়ে তুলুন।
১২. রমজানের মাসআলা ও পরিকল্পনা
রোজা ভঙ্গের কারণ, সাহরি-ইফতার বিধান জেনে নিন। মাসব্যাপী ইবাদত-রুটিন তৈরি করুন।
১৩. বাজার-সদাই আগেভাগে সম্পন্ন
রমজানে ভিড় এড়াতে প্রয়োজনীয় বাজার ও ঈদের কেনাকাটা শাবানেই সেরে নিন—শেষ দশকের ইবাদত বিঘ্নিত হবে না।
১৪. গৃহসজ্জা ও শিশুদের প্রস্তুতি
ঘরে নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করুন। শিশুদের জন্য রমজান-উপহার ও ছোট রুটিন রাখুন—রোজায় আগ্রহ বাড়বে।
১৫. উত্তম চরিত্রচর্চা
রোজা মানে শুধু না খাওয়া নয়; মিথ্যা, গিবত ও অশালীনতা বর্জন। রাসুল (সা.) বলেছেন, মন্দ কাজ ত্যাগ না করলে রোজার প্রয়োজন নেই (বোখারি: ১৯০৩)।
শাবান হলো রমজানের প্রবেশপথ। এই মাসে যত বেশি প্রস্তুতি, রমজানে তত বেশি আধ্যাত্মিক স্বাদ। জীবন অনিশ্চিত—আগামী রমজান পাব কি না জানা নেই। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে গনিমত জেনে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক আমাদের লক্ষ্য।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয়