
ইসলামে হালাল উপার্জন ও পবিত্র খাবার গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে দান-সদকা করার ক্ষেত্রেও অর্থের উৎস হালাল হওয়া জরুরি। কারণ, আল্লাহতায়ালা পবিত্র এবং তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা বাকারা : ১৬৮)
এ থেকে বোঝা যায়, একজন মুসলমানের উপার্জন যেমন বৈধ হতে হবে, তেমনি সেই উপার্জন থেকে করা দানও হতে হবে হালাল সম্পদ দিয়ে। কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই আল্লাহতায়ালা মুত্তাকিদের পক্ষ থেকে কবুল করেন।’ (সুরা মায়িদা : ২৭)
ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী, উপার্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রথমে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন পূরণ করতে হবে। এরপর অর্থ অবশিষ্ট থাকলে তা অসহায়, দুস্থ ও দরিদ্র মানুষের জন্য ব্যয় করা যেতে পারে। কারও হালাল উপার্জন থেকে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পর যদি অতিরিক্ত কিছু না থাকে, তাহলে তার ওপর গরিব-অসহায় মানুষের জন্য অর্থ ব্যয় করা জরুরি নয়।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘(হে রাসুল!) মানুষ আপনাকে জিজ্ঞেস করে, তারা কী ব্যয় করবে? বলে দিন, যা কিছু অতিরিক্ত ও উদ্বৃত্ত। এভাবে আল্লাহ তাঁর বিধান তোমাদের জন্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন; যাতে তোমরা চিন্তা কর।’ (সুরা বাকারা : ২১৯)
অন্যদিকে হারাম সম্পদ থেকে দান বা অর্থ ব্যয় করলে তা আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার আশা করা যায় না। এ বিষয়ে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা পবিত্র; তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রেরিত রাসুলদের যে নির্দেশ দিয়েছেন, মোমিনদেরও সে আদেশ করেছেন।’
এরপর তিনি আল্লাহর বাণী উল্লেখ করেন, ‘হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র ও হালাল জিনিস আহার কর এবং ভালো কাজ কর। আমি তোমাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে অবগত।’ (সুরা মোমিনুন : ৫১)
আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘তোমরা যারা ঈমান এনেছ, আমি তোমাদের যেসব পবিত্র জিনিস রিজিক হিসেবে দিয়েছি, তা থেকে খাও।’ (সুরা বাকারা : ১৭২)
এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যিনি দীর্ঘ সফর করে ধুলিধূসরিত ও রুক্ষ চুলে পরিণত হয়েছেন। তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে ‘হে আমার রব’ বলে দোয়া করছেন। অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং তার শরীরও হারাম খাদ্যে পুষ্ট। রাসুল (সা.) প্রশ্ন করেন, এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? (মুসলিম : ২২৩৬)
হারাম উপার্জনের সঙ্গে অন্যের অধিকার নষ্ট করার বিষয়ও জড়িত থাকতে পারে। কেউ যদি প্রতারণার মাধ্যমে অন্যের অর্থ আত্মসাৎ করে, তাহলে সে একদিকে প্রতারণা ও অনৈতিক কাজ করে, অন্যদিকে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করে মানুষের অধিকার নষ্ট করে। পাশাপাশি, ওই কাজ দেশের প্রচলিত আইন লঙ্ঘনেরও কারণ হতে পারে।
প্রতারণা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসলিম : ১০১)
অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বিষয়ে পরকালেও জবাবদিহি করতে হবে। মানুষের উপার্জন ও ব্যয়ের হিসাব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন কোনো মানুষ নিজের স্থান থেকে এক বিন্দুও সরতে পারবে না, যতক্ষণ না তার কাছ থেকে চারটি প্রশ্নের জবাব নিয়ে নেওয়া হবে। তার একটি প্রশ্ন হচ্ছে, নিজের ধন-সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে?’ (তিরমিজি : ২৪১৭)
তাই ইসলামের দৃষ্টিতে দান-সদকার পাশাপাশি সম্পদের উৎসও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন পূরণের পর যে অর্থ উদ্বৃত্ত থাকে, তা হালাল উৎস থেকে অর্জিত হলে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা যেতে পারে। তবে হারাম বা অবৈধ উপার্জন দিয়ে দান করে তা বৈধ করার সুযোগ নেই। একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো হালাল পথে উপার্জন করা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পবিত্র সম্পদ থেকে ব্যয় করা।