
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৭৪ ভরি স্বর্ণালংকারসহ তিনজন গ্রেপ্তারের ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ স্বর্ণ চোরাচালানের চিত্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মাঝেমধ্যে বড় বড় চালানসহ বাহকরা ধরা পড়লেও চোরাচালানের মূল হোতারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার নাসির মোল্লা (৪০), সোহাগ (২৪) ও হাছান মিয়া (২৩)-এর কাছ থেকে ৮৬১ দশমিক ৮ গ্রাম স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। এর বাজারমূল্য সোয়া কোটি টাকার বেশি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য দিয়েছে বলে জানিয়েছে এপিবিএন।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মূলত বাহক হিসেবে কাজ করেন। তাদের পেছনে দেশ-বিদেশে বিস্তৃত সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, বাংলাদেশ, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়াভিত্তিক একাধিক আন্তঃদেশীয় চক্র শাহজালাল বিমানবন্দরকে স্বর্ণ পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। এসব চক্রের সদস্যরা প্রবাসে অবস্থান করে যাত্রী ও বিমানকর্মীদের মাধ্যমে স্বর্ণের চালান দেশে পাঠায় বলে জানা গেছে।
চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা একে অপরকে সরাসরি না চিনে বিভিন্ন সংকেত ও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে স্বর্ণ হস্তান্তর করে থাকে বলে সূত্রের দাবি। ফলে কোনো বাহক আটক হলেও তার পেছনে থাকা মূল ব্যক্তিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গোয়েন্দা সূত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, বিদেশে অবস্থানকারী কয়েকজন মূল হোতা বাংলাদেশে থাকা ডিলারদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং তাদের সংশ্লিষ্টতা আদালতে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি এখনো বাকি।
শাহজালালে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি বড় স্বর্ণের চালান আটকের ঘটনা ঘটেছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট টেকনিক্যাল হেলপার সোয়েব কাজী সজিবের কোমরের বেল্টে লুকানো অবস্থায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণ জব্দ করা হয়। রিমান্ড শেষে শুক্রবার তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে গত ২ জুলাই দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের কার্গো হোল থেকে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।
গত ২৮ মার্চ রাতে দুবাই থেকে আসা বিমানের একটি ফ্লাইটের কার্গো অংশের টয়লেটের প্যানেলের ভেতর থেকে সাদা কাপড়ে মোড়ানো ১৫৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। স্বর্ণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ কেজি, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, সাম্প্রতিক বড় চালানগুলোর অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে।
বিমানবন্দর থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় মোট ৫৫০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি এবং ২০২৫-২৬ সালে ৯২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৪৯০ জনকে।
ঢাকা কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে শতাধিক অভিযানে প্রায় ২ হাজার কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থবছরভিত্তিক হিসাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬৯৭ কেজি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৪ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১৭ কেজি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৮ কেজি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৮ কেজির কিছু বেশি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে।
বিমানের ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিমানের কিছু কর্মচারী স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে সিনিয়র কর্মকর্তারাও অবগত।
বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্বর্ণসহ সব ধরনের চোরাচালানের বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, স্বর্ণ চোরাচালান অত্যন্ত লাভজনক হলেও ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধ। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে চোরাচালান প্রতিরোধে বিমান ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনেরও তাগিদ দেন তিনি।
বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার জানান, শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে সম্প্রতি স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনা বেড়েছে। এসব ঘটনায় কয়েকটি মামলা হয়েছে এবং প্রতিটি ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি জানান, ফলের আড়ালে স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক গোলাম মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকজন বিমানকর্মীর ওপর নজরদারি রাখা হয়েছে।
সর্বশেষ গ্রেপ্তার বিমানের কর্মী সোয়েবকেও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার কাছ থেকেও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ।
ওসি বলেন, তদন্তে কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে জড়িত সবার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।