
মাত্র এক দিনের ভারী বর্ষণেই আবারও অচল হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা ২০০৯ সালের পর এক দিনে সর্বোচ্চ। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন হলো—শুধু বেশি বৃষ্টিই কি এই দুর্ভোগের কারণ, নাকি এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল নগর পরিচালনার বহিঃপ্রকাশ?
রাজধানীর বনানী থেকে ফার্মগেট, শান্তিনগর থেকে মতিঝিল, মিরপুর থেকে ধানমন্ডি—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি। সড়ক, অলিগলি, দোকানপাট, বাসাবাড়ি—সবখানেই পানি ঢুকে পড়ে। বহু পরিবারকে খাটের ওপর আশ্রয় নিতে হয়েছে, নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অফিসগামী মানুষ ভেজা কাপড়ে কর্মস্থলে পৌঁছেছেন, কেউ অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে, কেউ আবার যানবাহন না পেয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন। দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকেই পুরো দিনের আয় হারিয়েছেন।
প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই চিত্র দেখা যায়। অথচ প্রতি বছরই শোনা যায় উন্নয়ন, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি। বাস্তবে দেখা যায়, সামান্য অতিবৃষ্টিতেই রাজধানী কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এটি স্পষ্ট করে যে, সমস্যাটি শুধু প্রাকৃতিক নয়; বরং পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতিই প্রধান কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাধার দখল, অপর্যাপ্ত ও অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, দীর্ঘদিনের খোঁড়াখুঁড়ি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা। ড্রেনের মুখ আবর্জনায় আটকে থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ পায় না। ফলে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় রূপ নেয়।
তবে দায় কেবল কর্তৃপক্ষের নয়। নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। যত্রতত্র প্লাস্টিক, বোতল ও ময়লা ফেলে ড্রেন বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা নগর ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠিন করে তোলে। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দুই সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, পানি নিষ্কাশনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কাজ করছেন। ফায়ার সার্ভিসও বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন পরিষ্কার করে পানি নামানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—সংকট তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগাম প্রস্তুতি কেন থাকে না? বর্ষা তো নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতি বছর একই সময়ে একই সমস্যা দেখা দেয়। তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কোথায়?
ঢাকার মতো একটি রাজধানী শহরে জলাবদ্ধতা আর মৌসুমি দুর্ভোগ হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। প্রয়োজন সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, আধুনিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নাগরিক দুর্ভোগ কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
এক দিনের বৃষ্টিতে যদি একটি রাজধানী শহর অচল হয়ে যায়, তবে তা শুধু অবকাঠামোগত দুর্বলতার নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক সীমাবদ্ধতারও প্রতিচ্ছবি। এখন সময় দায় এড়িয়ে যাওয়ার নয়; কার্যকর, টেকসই ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ নেওয়ার। অন্যথায় আগামী বর্ষায়ও ঢাকাবাসীকে একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি দেখতে হবে।