
ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি ও জ্বালানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে হামলার দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তেহরান এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের সরকারি মালিকানাধীন ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির (এনআইওসি) প্রধান নির্বাহী হামিদ বোভার্ড ট্রাম্পের দাবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছেন।
সোমবার (৩১ আগস্ট) এ মন্তব্য করেন হামিদ বোভার্ড।
এর আগে রোববার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে খার্গ দ্বীপে ব্যাপক বিস্ফোরণের একটি ভিডিও প্রকাশ করে সেখানে বড় ধরনের হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের দাবি করেন।
তবে ট্রাম্পের পোস্টের কয়েক ঘণ্টা পর পর্যন্ত খার্গ দ্বীপে হামলার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রয়টার্সের যাচাইয়ে দেখা গেছে, পোস্টের সঙ্গে থাকা বিস্ফোরণের ভিডিওটি সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি।
হামিদ বোভার্ড বলেন, খার্গ দ্বীপের পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে। সেখানে তেল উত্তোলন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। বরং কর্মীরা আগের ক্ষয়ক্ষতি মেরামত ও বিভিন্ন স্থাপনা আধুনিকায়নের কাজ করছেন।
এরই মধ্যে কয়েক সপ্তাহ পর আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। রোববার জুলাইয়ের শেষের পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, রোববার মার্কিন বাহিনী ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। লারাক দ্বীপটি খার্গ দ্বীপ থেকে প্রায় ৬৬০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত।
মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে রকেট ও সমুদ্র মাইন মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ কারণে হামলা চালানো হয়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য হুমকি তৈরির লক্ষ্যে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মাইন পাতা কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সীমিত ও নির্ভুল অভিযান চালানো হয়েছে।
মার্কিন হামলার জবাবে জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান হামলা চালিয়েছে বলে দেশটির গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, লারাক দ্বীপে হামলায় ব্যবহৃত মার্কিন ঘাঁটিগুলোই পাল্টা হামলার লক্ষ্য ছিল।
ইরানের সেনাবাহিনী আরও দাবি করেছে, সোমবার ভোরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়েছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
পরে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, তাদের বিমানবাহিনী ইরান থেকে আসা একটি ড্রোন নিজেদের আকাশসীমায় শনাক্ত করে প্রতিহত করেছে। তবে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এদিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড দাবি করেছে, তারা একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ড্রোনটি উপসাগরের পানিতে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণ হরমুজ প্রণালিতে দুটি নৌমাইনে আঘাত পাওয়ার পর একটি সুপারট্যাংকারে আগুন ধরে যায় এবং জাহাজটি চলাচল বন্ধ করে দেয়।
রেভল্যুশনারি গার্ডের দাবি, জাহাজটি অনুমতি ছাড়া ওই জলপথ অতিক্রমের চেষ্টা করছিল। তবে জাহাজটির নাম বা এতে থাকা ক্রুদের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। সংঘাতের কারণে এ জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শিপিং তথ্য অনুযায়ী, হামলার আশঙ্কায় সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৃশ্যমান পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা প্রতিদিন মাত্র পাঁচটিতে নেমে আসে। তবে কিছু জাহাজ স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রাখায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ উপসাগরীয় আরব দেশ ও জর্ডানকে লক্ষ্য করে ইরানের নেওয়া নীতির সমালোচনা করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়—এ ধরনের পরিস্থিতি টেকসই সমাধান হতে পারে না।
তিনি উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরুদ্ধার এবং একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরুর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প প্রশাসন ইরান ও দেশটির ব্যবসায়িক অংশীদারদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছিল।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে প্রতি সপ্তাহে নতুন করে সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হতে পারে। প্রাথমিকভাবে এসব নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য থাকবে বিভিন্ন ব্যাংক।
এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা প্রণালির সব মাইন বিস্ফোরিত বা অপসারণ করা হয়েছে। নতুন করে মাইন পাতা হলে সংশ্লিষ্ট জাহাজ ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি।
তবে ইরান ট্রাম্পের ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
খার্গ দ্বীপে সত্যিই হামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে ইরানের দাবি, দ্বীপটির তেল উত্তোলন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স