
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন সুরক্ষায় টানা তিন মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে খুলছে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ। দীর্ঘ বিরতির পর জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের পাশাপাশি পর্যটকরাও নিয়ম মেনে সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ পাবেন।
সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছরের মতো এবারও ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ ও সব ধরনের আহরণ কার্যক্রম বন্ধ ছিল। বন খোলার প্রস্তুতি হিসেবে গত জুলাই মাসে বিভিন্ন স্টেশনে বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) নবায়ন করা হয়। এর মধ্যে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনে ১ হাজার ১৬টি, কদমতলায় ৬২৩টি, কৈখালীতে ৪৩৮টি এবং কোবাতক স্টেশনে ৫৯২টি বিএলসি নবায়ন করা হয়েছে।
নিয়ম মেনে পাস-পারমিট নিয়ে জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা বনে প্রবেশ করতে পারবেন। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্যও উন্মুক্ত হচ্ছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বনের দুয়ার খুললেও ঘুষ-দুর্নীতি, দালাল সিন্ডিকেট এবং বনদস্যুদের চাঁদাবাজির আতঙ্কে উদ্বিগ্ন উপকূলীয় এলাকার হাজারো বনজীবী।
বনের দুয়ার খুললেও অনেক জেলের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক জেলে অভিযোগ করেন, সরকার নির্ধারিত বিএলসি নবায়ন ফি ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা হলেও চারটি স্টেশনে কর্মকর্তা ও দালালদের যোগসাজশে লাইসেন্সপ্রতি ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। সরাসরি ফি জমা দিতে গেলে তাদের দালালদের মাধ্যমে কাজ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
বনজীবীদের অভিযোগ, বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন, কদমতলা ও কৈখালী স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ রায় এবং কোবাতক স্টেশন কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে দালাল সিন্ডিকেটকে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। বিএলসি নবায়নে অনিয়মের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তারা। বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন, কদমতলা ও কৈখালীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ রায় এবং কোবাতক স্টেশন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
তাদের ভাষ্য, ধৃত মাছ ও কাঁকড়ার পরিমাণ এবং নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ফি হিসাব করা হয়। ফলে শুধু ৩৪ টাকা ৫০ পয়সাকেই চূড়ান্ত ফি হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক মশিউর রহমান বলেন, বিএলসি নবায়নে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে কোনো কর্মকর্তা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি তদন্ত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিন মাস পর সুন্দরবন খোলার খবরে শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুর ও কৈখালী এলাকায় কর্মচাঞ্চল্য ফিরলেও জেলেদের মধ্যে রয়েছে জলদস্যুদের আতঙ্ক।
স্থানীয় জেলে আমিরুল ইসলাম বলেন, “গত তিন মাস আয় বন্ধ থাকায় ধারদেনা করে পরিবার চালাতে হয়েছে। এখন বনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
আরেক জেলে রিপন গাজী বলেন, “পাস নিয়ে বনে নামব ঠিকই, কিন্তু দস্যুদের উৎপাত বড় দুশ্চিন্তার কারণ। বনে ঢুকলেই ডাকাত দলকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই।”
স্থানীয়দের দাবি, দস্যুদের চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের ঝুঁকির কারণে অনেক বনজীবী এবার সুন্দরবনে যেতে অনাগ্রহী।
জেলেদের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও সুন্দরবন খুলে দেওয়ায় পর্যটন খাতে স্বস্তি ফিরেছে। নীলডুমুর ট্রলার মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম বলেন, “পর্যটকদের ওপর নির্ভর করে এই অঞ্চলের প্রায় ৫০০ ট্রলার চলে। টানা তিন মাস বন্ধ থাকায় চালক ও শ্রমিকেরা কষ্টে দিন কাটিয়েছেন। এখন পর্যটক আসা শুরু করলে উপকূলীয় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।”
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন জানান, প্রশাসনিক প্রস্তুতি শেষে মঙ্গলবার থেকেই সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য পারমিট দেওয়া হচ্ছে। তবে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার, অবৈধ জাল ব্যবহার এবং বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
দীর্ঘ তিন মাস পর সুন্দরবনের দুয়ার খুললেও বনজীবীদের সামনে রয়েছে একদিকে জীবিকা ফিরে পাওয়ার আশা, অন্যদিকে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ ও বনদস্যুদের চাঁদাবাজির আতঙ্ক। তাই দালাল সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং বনদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন উপকূলের খেটে খাওয়া মানুষ।