
সুন্দরবনে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ প্রজনন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নদ-নদীতে মাছ ও কাঁকড়াসহ বনজ সম্পদ রক্ষায় প্রতিবছরের মতো এবারও তিন মাসের জন্য পর্যটক ও সাধারণ মানুষের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ না থাকলেও বনের কোলঘেঁষা ‘আকাশলীনা’ ইকো ট্যুরিজম সেন্টারে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। সুন্দরবন বন্ধ থাকায় বনভ্রমণের আক্ষেপ অনেকটাই দূর করছে এই পর্যটনকেন্দ্র।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী কলবাড়ি এলাকায় জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছে আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টার। চুনা ও মালঞ্চ নদীর তীরে অবস্থিত এ পর্যটনকেন্দ্রের ওপারেই বিস্তৃত সুন্দরবন। কেওড়া, গেওয়াসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ, নদীর জোয়ার-ভাটা, পাখির কলকাকলি ও সবুজের সমারোহে এখানকার পরিবেশ হয়ে উঠেছে সুন্দরবনঘেঁষা এক অনন্য ভ্রমণকেন্দ্র।

পর্যটকদের জন্য আকাশলীনায় রয়েছে হাঁটার ট্রেইল, ওয়াচ টাওয়ার, আব্দুস সামাদ ফিস মিউজিয়াম, পরিবেশবান্ধব ইকো কটেজ ‘বনবিলাস’, বিশ্রামাগার ও ‘বাদাবনের হেঁসেল’ নামে রেস্টুরেন্ট। পাশাপাশি চুনা ও মালঞ্চ নদীতে নৌভ্রমণের ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে সুন্দরবন বন্ধের সময় প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন আকাশলীনা।

পর্যটক ও সিনিয়র সাংবাদিক শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন বলেন, সুন্দরবন বন্ধ থাকায় বনের ভেতরে যেতে না পারার আক্ষেপ থাকে। তবে আকাশলীনায় এসে সেই শূন্যতা অনেকটাই পূরণ হয়। এখানকার গাছপালা, নদী ও প্রাকৃতিক পরিবেশে সুন্দরবনের অনুভূতি পাওয়া যায়। মাঝেমধ্যে হরিণ বা কুমিরও দেখা যায় বলে জানান তিনি।
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা আমেনা বিলকিস ময়না বলেন, আকাশলীনায় এসে মনে হয়েছে যেন সুন্দরবনেরই একটি অংশে এসেছেন। প্রাকৃতিক পরিবেশ, গাছপালা, থাকার ব্যবস্থা ও নৌভ্রমণের সুবিধা—সব মিলিয়ে পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি দারুণ।

বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা শিক্ষার্থী নুরজাহান বলেন, আগে শুধু আকাশলীনার কথা শুনেছিলেন। এবার এসে জায়গাটির পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। এখান থেকে সুন্দরবন দেখা যায়। সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকলেও আকাশলীনায় এসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
আকাশলীনা ঘিরে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। চুনা ও মালঞ্চ নদীতে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা মাঝিরা পর্যটকদের নৌভ্রমণ করিয়ে আয় করছেন। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টারের সুপারভাইজার রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল বলেন, এখানে প্রবেশমূল্য মাত্র ২০ টাকা। প্রতিবছর জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ থাকে। এ সময় বনের ভেতরে যেতে না পারা অনেক পর্যটক আকাশলীনায় আসেন। বর্তমানে পর্যটক কিছুটা কম থাকলেও ছুটির দিনগুলোতে ভালো ভিড় হয়। পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে।

শ্যামনগর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, আকাশলীনাকে আরও আকর্ষণীয় করতে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা অবস্থান, নদী ও ম্যানগ্রোভের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং পর্যটন সুবিধার কারণে ইতোমধ্যে এটি সাতক্ষীরার অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের পাশাপাশি আকাশলীনার মতো পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়ন স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে টেকসই পর্যটনের বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে এ ধরনের উদ্যোগ।
এদিকে সুন্দরবনে পর্যটক ও সাধারণ মানুষের প্রবেশে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে আগামী ৩১ আগস্ট। ফলে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য আবারও সুন্দরবন উন্মুক্ত হবে। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে সুন্দরবন ভ্রমণে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে জেলেদের প্রবেশের অনুমতিও দেওয়া হবে। এজন্য এরই মধ্যে জেলেরা নৌকা, মাছ-কাঁকড়া ধরার জাল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করেছেন। তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর সরকারি পাস নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। এতে জেলে পাড়াগুলোতে বিরাজ করছে স্বস্তির পরিবেশ।