
নেপালের উত্তর সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলায় বুধবার সকালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বা হড়পা বানে ভোতেকোশি নদীর তীরবর্তী জনপদ লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। নেপাল-চীন সীমান্তের তিমুর ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় বন্যার পানির সঙ্গে নেমে আসা প্রবল ঢল ও ধ্বংসাবশেষে সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিধ্বস্ত হয়েছে। ঘটনার তিন দিন পরও নিখোঁজদের সন্ধানে নদীতীর ও ভাটির জনপদগুলোতে উদ্ধার অভিযান চলছে।
নেপালের হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা ৫০০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। শুক্রবার সকালে দেশটির সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, বিপর্যয়ে ৪৭৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন সরকারি সূত্রে মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের পর নতুন সংকটে পড়েছে নেপাল সরকার। একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় সেগুলো সংরক্ষণের জন্য মর্গ ও হাসপাতালগুলোতে জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও শুকনো বরফেরও সংকট রয়েছে। ফলে অশনাক্ত মরদেহ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
নেপালের পোখরা একাডেমি অব হেলথ সায়েন্সের পরিচালক সুশীল আরিয়ালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মর্গে ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মরদেহ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এভাবে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৪ দিন মরদেহ রাখা সম্ভব। এর পর সেগুলো সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বুধবার সকালে রাসুয়া জেলায় ভোতেকোশি নদীতে হড়পা বান নেমে আসে। তিব্বত সীমান্তের কাছে গ্রামের পর গ্রাম নদীর পানি ও কাদামাটির প্রবল স্রোতে ভেসে যায়। এরপর থেকে উদ্ধারকাজ চলছে এবং প্রতিদিনই নদী ও ভাটির বিভিন্ন এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে।
বন্যার প্রবল স্রোতে অনেক মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ভেসে গেছে। ফলে স্বজনদের পক্ষে মরদেহ শনাক্ত করতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। সময়ের মধ্যে স্বজনরা মরদেহ শনাক্ত করতে না পারলে অশনাক্ত মরদেহের গণসৎকারের বিষয়টি বিবেচনা করছে নেপাল সরকার। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
চিতওয়ান জেলার সরকারি কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার এ নিয়ে বৈঠক করেছেন। জেলার বিভিন্ন মর্গ মিলিয়ে একসঙ্গে মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব। এরই মধ্যে সেগুলো পূর্ণ হয়ে গেছে। নতুন করে উদ্ধার হওয়া ১৩৭টি মরদেহের জন্য কিছু পরিত্যক্ত ভবন শনাক্ত করে সেখানে অস্থায়ীভাবে আরও প্রায় ২৫০টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে মর্গ ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্যরা। অনেকেই নিখোঁজ স্বজনের ছবি হাতে নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে ঘুরছেন।
এই বিপর্যয়ের মধ্যে নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় আরও একটি হড়পা বানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে উদ্ধার কার্যক্রম নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে নিখোঁজ রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভারতীয় বংশোদ্ভূত দম্পতি দীপক ও মধু আহুজা। দীপকের ৬০তম জন্মদিন উপলক্ষে তারা কৈলাস-মানস সরোবর ভ্রমণে নেপালে গিয়েছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, কৈলাসযাত্রা শেষ করে বুধবার আহুজা দম্পতি গিরং পোর্টের অভিবাসন দপ্তরের কাছে পৌঁছান। চীনের স্থানীয় সময় তখন সকাল ৯টা। ঠিক সেই সময় হড়পা বান নেমে আসে এবং গিরং পোর্টের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর থেকে তাদের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই।
দুই মেয়ে শ্রেয়া ও আসনা জানিয়েছেন, বাবা-মায়ের সর্বশেষ অবস্থান ছিল তিব্বত-নেপাল সীমান্তের গিরং এলাকায়। পরিবারের সদস্যদের আশঙ্কা, তারা এখনো চীন সীমান্তের দিকেই আটকা পড়ে থাকতে পারেন।
শ্রেয়া এনডিটিভিকে বলেন, বাবা-মা কৈলাসযাত্রা শেষ করে তিব্বত-নেপাল সীমান্তে পৌঁছেছিলেন। গিরং সীমান্ত থেকেই তাদের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছিল। এরপরই হড়পা বানের খবর পান তারা।
এদিকে ভয়াবহ বন্যার সময় প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু পাহাড়ে উঠে প্রাণে বেঁচেছেন রাসুয়া জেলার তিমুর বাজারের শুল্ক দপ্তরের কর্মী রাজু বুধাথোকি।
বুধবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন রাজু। হঠাৎ মাটি কেঁপে উঠতে শুরু করলে প্রথমে তিনি ভূমিকম্প মনে করেন। বাইরে বের হয়ে দেখেন চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আকাশ কালো হয়ে গেছে এবং দূর থেকে বিকট শব্দ ভেসে আসছে।
অদূরের একটি পুলিশ চৌকির দিকে ছুটে গেলেও সেখানে গিয়ে দেখেন, পুলিশ সদস্যরাও প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছেন। পেছনে তাকিয়ে তিনি দেখতে পান, তিমুর বাজারের বাড়িঘর ও দোকানপাট প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। ভোতেকোশি নদীর উত্তাল পানি বড় বড় ভবনও গ্রাস করছে।
এরপর আর দেরি না করে পাহাড়ের দিকে ছুটতে শুরু করেন রাজু। পুলিশ পোস্টের তারের বেড়া পার হওয়ার সময় হাতে আঘাত পেলেও থামেননি। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু পাহাড়ের একটি জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেন।
রাসুয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাজু কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, পাহাড়ের ওপর থেকে তিমুরের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন—সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তার অনেক সহকর্মী ও প্রতিবেশী এখনো নিখোঁজ। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও বেঁচে ফেরাকে তিনি জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
রাজুর মতো তিমুর বাজারের কাস্টমস দপ্তরের আরেক কর্মী গৌতমও প্রাণ বাঁচাতে পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত তাকেও অন্যদের সঙ্গে পাহাড়েই থাকতে হয়।
গৌতম জানান, বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দেওয়া নুডলসের প্যাকেট খেয়ে তারা কোনোভাবে রাত পার করেন। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে আরেকটি হেলিকপ্টার এসে তাদের বিদুরে নিয়ে যায়। হেলিকপ্টারে ওঠার পরই প্রথমবারের মতো বেঁচে থাকার স্বস্তি অনুভব করেন তিনি।
বন্যায় নুয়াকোট জেলার বাসিন্দা কল্পনা মল্লা পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে হারিয়েছেন। বিবিসিকে তিনি জানান, তার চোখের সামনেই পরিবারের সদস্যদের বন্যার পানিতে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে স্রোত।
কল্পনা বলেন, বাবা, মা, বোন ও বোনের সন্তানদের বাঁচানোর কোনো সুযোগ তিনি পাননি। শুধু তিনি ও তার ছেলে ঘরের ছাদে উঠে কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছেন।
কল্পনার ছেলে সুগম মল্লা জানান, বিপদের সময় তিনি মায়ের হাত ধরে তাকে রক্ষা করেন। যোগাযোগের জন্য নিজের মোবাইল ফোনটি বোনের কাছে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সেটি আর বাজছে না। তার আশঙ্কা, বোনও হয়তো বন্যার স্রোতে ভেসে গেছেন।
আরেক বাসিন্দা গোমা পণ্ডিত হারিয়েছেন গবাদিপশু, আবাদি জমি ও ফসল। তিনি জানান, তার সব মোষ ও গবাদিপশু ভেসে গেছে। প্রায় ১০ বস্তা সরিষা, টনকে টন ভুট্টা ও ধানও নষ্ট হয়েছে। ভয়াবহ এই বন্যায় তাদের জীবিকা ও সম্পদের প্রায় সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে।
নেপালের এই ভয়াবহ বন্যায় একদিকে বাড়ছে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা, অন্যদিকে উদ্ধার হওয়া মরদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্তকরণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও প্রতিকূল পরিস্থিতি ও নতুন করে বন্যার আশঙ্কা উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, আলজাজিরা, কাঠমান্ডু পোস্ট