1. dsdc.mostafiz@gmail.com : mrahman :
  2. live@www.media71bd.com : Media 71 : Media 71
  3. info@www.media71bd.com : Media 71 :
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৭ অপরাহ্ন
সর্বশেষঃ
শিশু হাসপাতালে কক্ষে ধূমপান, চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ, মাঠপর্যায়ে অসংগতি ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ আজ খোলা থাকছে সকল ব্যাংক মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর আগে জানত না ঢাকা ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার: প্রধানমন্ত্রী ইয়েমেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ লক্ষ্য করে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কর্মসংস্থানমুখী কারিগরি শিক্ষা গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ: শিক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার: আইএমএফ সিরাজদিখানে শিশুদের খেলার মাঠ রক্ষার দাবিতে ৫০০ গ্রামবাসীর মানববন্ধন খুলনায় দুর্গাপূজায় চার স্তরের নিরাপত্তা, দায়িত্বে ১১ হাজারের বেশি সদস্য

যেভাবে তৈরি ‘ঘুষ ডট সাইট’

এম আর রোমেল, বিশেষ প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে গিয়ে একের পর এক দপ্তরে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছিল ১৭ বছরের শাহেদ শরীফ আহমেদের পরিবার। নিজের পাসপোর্ট করাতেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। সরকারি সেবা পেতে অর্থ দাবির এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই ভিন্ন কিছু করার চিন্তা আসে শাহেদের মাথায়। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি করেছে ‘ঘুষ ডট সাইট’—যেখানে পরিচয় গোপন রেখে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন সাধারণ মানুষ।

ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন শাহেদের মা আমিনা খাতুন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় মারা যান তিনি। মৃত্যুর সময় তার চাকরির বয়স হয়েছিল ১৩ বছর।

মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারের পাওনা ছিল প্রায় সাত লাখ টাকা প্রভিডেন্ট ফান্ড। সেই অর্থ তুলতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যেতে হয়। শাহেদের পরিবারের অভিযোগ, টাকা ছাড় করাতে একাধিক জায়গায় ঘুষ দিতে হয়েছে। তাদের দাবি, ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে আট হাজার টাকা—সব মিলিয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পেতেই ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।

পরিবারের দাবি, এরপরও তাদের ভোগান্তি শেষ হয়নি। কল্যাণ তহবিলের দুই লাখ টাকা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আট লাখ টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে। এসব অর্থের ফাইল এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আরও এক লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ শাহেদের পরিবারের। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলেও জানানো হয়েছে বলে তাদের দাবি।

মায়ের প্রাপ্য অর্থ পেতে এমন অভিজ্ঞতা শাহেদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। সরকারি ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভের পাশাপাশি তার মনে প্রশ্ন জাগে—একজন সাধারণ মানুষ কেন নিজের বৈধ পাওনা পেতেও ঘুষ দিতে বাধ্য হবেন?

পাসপোর্ট করাতেও ঘুষের অভিযোগ

ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বাবার সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকা শাহেদ বর্তমানে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়ছে। পড়াশোনার পাশাপাশি ওয়েবসাইট তৈরি ও কোডিংয়ের প্রতি তার আগ্রহ রয়েছে। প্রযুক্তির সেই জ্ঞানই এবার ঘুষের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে কাজে লাগিয়েছে সে।

শাহেদের ভাষ্য, মায়ের পেনশনের ফাইল আটকে রেখে লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হচ্ছিল। এর আগে প্রায় দেড় বছর আগে ও-লেভেল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য পাসপোর্ট করতে গিয়েও একই অভিজ্ঞতা হয় তার। তার অভিযোগ, ফাইল আটকে রেখে এক হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। টাকা দেওয়ার মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্টের কাজ সম্পন্ন হয়।

এসব অভিজ্ঞতাই তাকে ‘ঘুষ ডট সাইট’ তৈরির সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে বলে জানান শাহেদ।

দুই ঘণ্টার কোডিং থেকে বড় উদ্যোগ

একটি ভারতীয় ওয়েবসাইট দেখে ধারণাটি পান শাহেদ। এরপর মাত্র দুই ঘণ্টার কোডিংয়ে তৈরি করেন ‘ঘুষ ডট সাইট’-এর প্রাথমিক কাঠামো। পরে বন্ধু ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহযোগিতায় ডোমেইন কেনা হয়। গত ২১ আগস্ট সাইটটি চালু করা হয়। পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ১০০ ডলার।

শুরুতে শাহেদও ভাবেননি, এত অল্প সময়ে ওয়েবসাইটটি মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলবে। তার ধারণা ছিল, এটি হয়তো জীবনবৃত্তান্তে যুক্ত করার মতো একটি ছোট প্রকল্প হিসেবেই থাকবে। তবে সাইট চালুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

মাত্র নয় দিনের মধ্যে শনিবার দুপুর পর্যন্ত ওয়েবসাইটটিতে ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকার মধ্যে বলে জানানো হয়েছে।

অভিযোগের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় বর্তমানে চার সদস্যের একটি পর্যালোচনা দল সেগুলো যাচাই করছে। ড্যাশবোর্ডে ফিল্টার করার পর যাচাই করা অভিযোগগুলো ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হচ্ছে।

অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখার উদ্যোগ

ঘুষের অভিযোগ জানাতে গিয়ে কোনো ব্যক্তি যাতে নতুন করে বিপদে না পড়েন, সে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। এ কারণে অভিযোগকারীদের পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে।

শাহেদ জানায়, এখন পর্যন্ত তারা কোনো হুমকি পায়নি। সাইটটি এত দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে, সেটিও তারা ভাবেনি। তবে সম্ভাব্য আইনি ঝুঁকি বিবেচনায় ভুক্তভোগীর নাম-পরিচয় কিংবা নির্দিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।

ভবিষ্যতে আইনি দল গঠন করা সম্ভব হলে অথবা সরকারি সমর্থন পাওয়া গেলে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান উদ্যোক্তারা।

শাহেদের লক্ষ্য শুধু অভিযোগের তালিকা তৈরি করা নয়। তার ভাষায়, সরকারি অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কোথায় অপচয় হচ্ছে—সেটি মানুষের সামনে তুলে ধরাও তাদের উদ্দেশ্য। শেষ পর্যন্ত সরকারি সেবা নিতে গিয়ে যেন কাউকে ঘুষ দিতে না হয়, সেটিই তাদের প্রত্যাশা।

ছেলের উদ্যোগে বাবার পূর্ণ সমর্থন

শাহেদের এই উদ্যোগের পেছনে সবচেয়ে বড় সমর্থন রয়েছে তার বাবা শরিফুল ইসলাম শামীমের। একসময় সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে চাকরি করা শরিফুলও স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি অর্থ পেতে গিয়ে ঘুষের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানান।

স্ত্রীকে হারানোর শোকের মধ্যেই পরিবারের প্রাপ্য অর্থের জন্য সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয়েছে তাকে। একদিকে জীবনসঙ্গীকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে নিজের বৈধ পাওনা পেতে ঘুষ দেওয়ার চাপ—দুই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

শরিফুলের অভিযোগ, স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি টাকা তুলতে গিয়ে বাধ্য হয়ে ঘুষ দিতে হয়েছে। তবে এখনো পরিবারের প্রায় ১০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। সেই অর্থ পেতেও এক লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিস থেকে টাকা না দিলে কাজ হবে না বলেও জানানো হয়েছে বলে তার অভিযোগ।

তবে এবার আর ঘুষ দিতে রাজি নন শরিফুল। ঘুষ না দিয়েই বাকি টাকা তুলতে চান তিনি। এ কারণে ছেলের উদ্যোগকে নিজের অভিজ্ঞতার প্রতিবাদ হিসেবেও দেখছেন তিনি এবং এতে তার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে বলে জানান।

ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার শিক্ষা কর্মকর্তার

ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী মো. মজিবুর রহমান। তার দাবি, কেউ তার কাছে এলে তিনি সহযোগিতা করেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এলে দ্রুত স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করেন।

সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মনিকা পারভীন বলেন, ঘুষ চাওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ তাকে কিছু জানাননি। এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পরিবারের বকেয়া অর্থ দ্রুত পরিশোধের আশ্বাস দেন তিনি।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তরুণদের এই উদ্যোগ পুলিশের নজরে এসেছে। ঘুষ বা অনিয়মের কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা তৈরি হলে পুলিশও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান টিটু বলেন, ঘুষের কারণে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা ঘুষের চিত্র এমন উদ্যোগের মাধ্যমে সামনে আসছে। সরকারের উচিত প্রযুক্তিনির্ভর এসব স্বচ্ছতার উদ্যোগকে কাজে লাগানো। এতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।

মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারের প্রাপ্য অর্থ পেতে ঘুষের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত শাহেদকে অন্যদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার উদ্যোগ নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে তার এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি ওয়েবসাইট নয়, বরং নিজের দেখা অনিয়মের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির একটি প্রচেষ্টাও।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© ২০২৬- প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট

You cannot copy content of this page