
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়েছে। এ অধিবেশনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপন ও পাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট, আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সংসদ উত্তপ্ত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনে অধিবেশন শুরু হয়। এর আগে গত ১৫ জুলাই চলতি সংসদের বাজেট অধিবেশন শেষ হয়েছিল।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, একটি অধিবেশন শেষ হওয়ার পর ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন বসার নিয়ম রয়েছে। সে অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এ অধিবেশন আহ্বান করেন।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, এবারের অধিবেশন ৫, ৭ অথবা ১০ দিনের সংক্ষিপ্ত হতে পারে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী এর মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে।
অধিবেশন সংক্ষিপ্ত হলেও অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ আইন বা বিল উত্থাপিত হতে পারে। এর মধ্যে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬’, ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন-২০২৬’ এবং ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) আইন-২০২৬’ রয়েছে।
এ ছাড়া গুম ও মানবাধিকার সুরক্ষা-সংক্রান্ত বিল এবং সম্পত্তি হস্তান্তর বিলও গুরুত্ব পেতে পারে।
প্রস্তাবিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বিষয়ে চিফ হুইপ জানান, বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দিলেও তারা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তির ভোগদখল ও ব্যবহারের অধিকার বজায় রাখবেন। এর মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা রোধ করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
এবারের অধিবেশনে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হতে পারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে আবাসিক গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। এর পাশাপাশি দফায় দফায় লোডশেডিং নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি আগের সরকারের সময়ে আদানির সঙ্গে করা বিদ্যুৎ চুক্তিকে দেশের জন্য ‘গর্হিত অপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার অভিযোগ, দায়মুক্তির ব্যবস্থা রেখে বিদ্যুৎ খাতে এমন কিছু চুক্তি করা হয়েছে, যা দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশ—তিন মাসের কৌশলগত জ্বালানি মজুদ, পাইপলাইন এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ প্রকল্প—বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা প্রশ্ন তুলতে পারেন।
এ ছাড়া নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারকে বিরোধীদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে।
এ অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চিফ হুইপ জানিয়েছেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এতে বিএনপি থেকে সাতজন, জামায়াত থেকে পাঁচজন এবং অন্যান্য দল থেকে একজন করে সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিরোধী দল নাম দিলে তাদেরও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
দক্ষিণ প্লাজায় সব দল সম্মিলিতভাবে যে অঙ্গীকার করেছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান চিফ হুইপ।
অধিবেশন সামনে রেখে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন নিয়েও আলোচনা চলছে। জাতীয় সংসদের মোট ৫০টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৫টি গঠন করা হয়েছে। বাকি রয়েছে ৩৫টি কমিটি।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সদস্যদের নাম পাওয়ার পর এসব কমিটি চূড়ান্ত করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অধিবেশনের শুরুতে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানানো হতে পারে। গত ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিরোধী দলের সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, অধিবেশনে তাদের ভূমিকা কী হবে, তা দলীয় বৈঠকে নির্ধারণ করা হবে। তবে তারা কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চান।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ-জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তারা কথা বলবেন এবং বিভিন্ন বিলের ওপর আলোচনার জন্য পর্যাপ্ত সময় দাবি করবেন।