
ভারতে এবার শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও স্কুলের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে জেন আলফা প্রজন্মের শিশু-কিশোররা। দেশের বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি স্কুলে জরাজীর্ণ ভবন, শিক্ষক সংকট, বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, বেঞ্চ ও খাবারের মানসহ নানা সমস্যা নিয়ে তারা ক্লাস বর্জন ও বিক্ষোভ করছে।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে জেন-জি আন্দোলন শুরু হয়েছিল। গত জুলাইয়ে শুরু হওয়া ওই আন্দোলন বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের পর ভারতের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
জেন-জি আন্দোলনের পর এবার স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোরদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভকে ভারতে নতুন একটি প্রজন্মের আন্দোলনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আল জাজিরায় শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেন আলফা প্রজন্মের এই আন্দোলন ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে তরুণদের সমর্থন ধরে রাখতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের জন্যও এটি নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশের সমূহি ভাতপুরওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ভারতের অন্তত ১০টি রাজ্যের গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থীরা জীর্ণ স্কুল ভবন, শিক্ষক সংকট, বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি ও নিম্নমানের মিড ডে মিলের প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন ও বিক্ষোভ করেছে।
এই আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে উত্তরপ্রদেশের ভাতপুরওয়া গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গত ২২ আগস্ট বিদ্যালয়টির ১২২ জন শিক্ষার্থী ক্লাসে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের মধ্যে ছয় বছর বয়সী শিশুও ছিল।
শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে ফিরবে না।
ভাতপুরওয়া গ্রামের স্কুলটির বর্তমান ভবন দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ২০২৩ সালে ভবনের একটি দেয়াল ভেঙে পড়ে এক ছাত্রী গুরুতর আহত হয়। এরপর ভবনের একটি অংশ ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
সেই ঘটনার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিল। ২২ আগস্ট তারা ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে নামলে বিষয়টি গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
পরে শিক্ষা বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্কুল পরিদর্শনে আসেন। ব্লক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক অবস্থি শিক্ষার্থীদের দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস দেন। সন্ধ্যা হয়ে আসায় পরে শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরে যায়।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া আট বছর বয়সী প্রিয়া আল জাজিরাকে বলে, স্কুল ভবনের অবস্থা নিয়ে তারা সবসময় আতঙ্কে থাকে। ভবনটি নিয়ে ভয় থাকায় পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস পাওয়ায় সে সন্তোষ প্রকাশ করে।
১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে সাধারণভাবে ‘জেনারেশন জেড’ বা ‘জেন-জি’ বলা হয়। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মের পরের প্রজন্মকে বলা হচ্ছে ‘জেন আলফা’।
২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া জেন আলফা প্রজন্ম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ট্যাবলেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের সময় বেড়ে উঠছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরপ্রদেশের ভাতপুরওয়ার পাশাপাশি জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে মহারাষ্ট্র, বিহার, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড ও মধ্যপ্রদেশসহ অন্তত ১০টি রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে একই ধরনের প্রতিবাদ হয়েছে।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার সরকারি স্কুলগুলোতে অবকাঠামো ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের ‘সর্বদয়া ইন্টার কলেজ’-এর দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মনোজ জানান, গত ২৮ জুলাই তারা স্কুলের ইউনিফর্ম পরে প্রতিবাদে অংশ নেন। তাদের স্কুলে খাবার পানি, বিদ্যুৎ এবং পর্যাপ্ত বেঞ্চ নেই বলে জানান তিনি।
মনোজের ভাষ্য, বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের মধ্যে শ্রেণিকক্ষে ফ্যান চলে না। পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে মেঝেতে বসতে হয়। এসব সমস্যার সমাধানের দাবিতেই তারা আন্দোলনে নামেন।
তার সহপাঠী নীলম জানান, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক সুবিধার দাবি জানিয়ে আসছিল। এবার প্ল্যাকার্ড ও স্লোগানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।
এরপর ৩১ জুলাই মহারাষ্ট্রের পারলিতে ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত বৈদ্যনাথ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে মিছিল করে।
ভারতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। প্রায় ১৫ লাখ স্কুলে ২৪ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এসব স্কুলের প্রায় ৭০ শতাংশ কেন্দ্রীয়, রাজ্য বা স্থানীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়। বাকিগুলো বেসরকারি ও বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত।
তবে অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যায় অনেক সরকারি স্কুল জর্জরিত বলে শিক্ষা অধিকারকর্মীরা দাবি করছেন।
বেঙ্গালুরুভিত্তিক শিক্ষা অধিকারকর্মী নাগাসিমহা রাও বলেন, শিশুরা তাদের অধিকার ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধা দাবি করছে। তাদের প্রয়োজন শিক্ষক, বেঞ্চ, স্কুল ভবন, খাবার পানি, বিদ্যুৎ ও টয়লেট।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্কুল পরিচালনার মৌলিক অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি রয়েছে। সরকারি স্কুলে পড়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক পরিবার থেকে আসায় এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবহেলা করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
চলমান শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনে জেন আলফা প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে জেন-জি প্রতিনিধিরাও বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে সিজেপি তাদের তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোগ ‘স্কুল ঠিক কর’ কর্মসূচি চালু করে।
সিজেপির আইনি বিষয়ক প্রধান রত্না সিং বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নের দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে তারা সমর্থন করছেন।
তিনি জানান, দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলনের সময় ছোট শিশু ও গ্রামীণ এলাকার অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে স্কুলের জরাজীর্ণ অবস্থা, শিক্ষক সংকট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যার কথা জানা গেছে।
রত্না সিংয়ের মতে, শিশুদের উন্নত ভবিষ্যতের জন্য স্কুলের পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জেন-জি আন্দোলনেরই একটি স্বাভাবিক অগ্রগতি।
এদিকে জেন-জি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মোদী সরকারের ভূমিকা নিয়েও আল জাজিরার প্রতিবেদনে সমালোচনামূলক বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটির দাবি, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার পরিবর্তে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলায় ক্ষোভ আরও বেড়েছিল। পরে বেকারত্ব ও দুর্নীতির মতো বিষয়ও আন্দোলনের আলোচনায় আসে।
জেন-জি আন্দোলনের পরপরই জেন আলফা প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের শিক্ষা সংস্কারকেন্দ্রিক এই বিক্ষোভ ভারতে নতুন ধরনের ছাত্র আন্দোলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।