
ইসলাম মানুষকে অর্থ-সম্পদ কুক্ষিগত করে না রেখে অসহায়, দরিদ্র ও অভাবীদের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করেছে। দান ও বিসর্জনের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসাকে ইসলামে মহৎ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে সম্পদ সঞ্চয়ের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি এবং দারিদ্র্যের ভয়কে মানুষের জন্য শয়তানের কুমন্ত্রণা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ করে, আর আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় মাগফিরাত ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা : ২৬৮)
ইসলামের শিক্ষা হলো, সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা। রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্যের কল্যাণ সাধন, অসহায়দের সাহায্য করা এবং নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘দ্বীন মানেই কল্যাণকামিতা।’ (মুসলিম : ১০০)
ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো—এ ধর্ম মানুষকে পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার শিক্ষা দেয়।
ইসলামের সূচনালগ্নে মক্কার মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ ছেড়ে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হন, তখন মদিনার আনসার সাহাবিরা তাদের আন্তরিকভাবে বরণ করে নেন। নিজেদের প্রয়োজন ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তারা মুহাজিরদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। নিজেদের প্রয়োজনের ওপর অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে তারা মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
পবিত্র কোরআনে আনসারদের এই গুণের প্রশংসা করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা নিজেদের ওপর (মুহাজিরদের) প্রাধান্য দেয়। যদিও নিজেদের প্রয়োজন ও অভাব থাকে। যারা স্বভাবগত কার্পণ্য হতে মুক্তি লাভ করে, তারাই তো সফলকাম।’ (সুরা হাশর : ৯)
অন্য আয়াতে জান্নাতের অধিকারীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘তারা খাবারের প্রতি নিজেদের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও বন্দীদের খাবার দান করে।’ (সুরা দাহর : ৮)
এসব আয়াত থেকে বোঝা যায়, প্রকৃত দান শুধু উদ্বৃত্ত সম্পদ বিলিয়ে দেওয়া নয়; বরং নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্যেও দানের মহত্ত্ব নিহিত।
অনেক সময় মানুষ এমন জিনিস দান করে, যা তার নিজের কাছেই আর প্রয়োজনীয় নয়। নষ্ট, পুরনো কিংবা অকেজো বস্তু দিয়ে দান-খয়রাতের দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করা হয়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, দানের ক্ষেত্রে উত্তম ও প্রিয় বস্তু বেছে নেওয়া।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না কর। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, আল্লাহ তা জানেন।’ (সুরা আলে ইমরান : ৯২)
এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের প্রিয় সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মদিনার আনসারদের মধ্যে আবু তালহা (রা.) ছিলেন প্রচুর খেজুরবাগানের মালিক। ‘বায়রুহা’ নামের একটি বাগান ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ওই বাগানে যেতেন এবং সেখানকার সুপেয় পানি পান করতেন।
যখন ‘তোমরা যা ভালোবাস, তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত কখনও পুণ্য লাভ করবে না’—এই আয়াত নাজিল হলো, তখন আবু তালহা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে তার প্রিয় বাগানটি আল্লাহর নামে সদকা করার ঘোষণা দেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তার এই উদ্যোগের প্রশংসা করে তাকে বাগানটি আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর আবু তালহা (রা.) তা বাস্তবায়ন করেন। (বোখারি : ১৪৬১)
এই ঘটনা প্রমাণ করে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয় সম্পদ ব্যয় করা দানের অন্যতম উত্তম দৃষ্টান্ত।
‘প্রিয় বস্তু’ বলতে শুধু দামি বা মূল্যবান জিনিস বোঝায় না। কোনো ব্যক্তি যে জিনিসকে নিজের প্রয়োজনীয় ও প্রিয় মনে করেন, সেটিও তার জন্য প্রিয় বস্তু হতে পারে। তাই দানের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো নিয়ত, আন্তরিকতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য।
পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদাররা! নিজেদের উপার্জন থেকে এবং যা কিছু আমি তোমাদের জন্য জমি থেকে উৎপন্ন করেছি, আল্লাহর পথে তার উত্তম বস্তু ব্যয় কর। আর এমন নিকৃষ্ট জিনিস দানের জন্য নির্বাচন করো না, যা তোমাদের দেওয়া হলে তোমরাও তা গ্রহণ করতে চাইবে না।’ (সুরা বাকারা : ২৬৭)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, দানের ক্ষেত্রে এমন বস্তু বেছে নেওয়া উচিত, যা গ্রহণ করতে নিজেরও আপত্তি থাকবে না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, নিজের সব প্রিয় সম্পদ একসঙ্গে দান করে দিতে হবে। বরং সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো ও পছন্দের বস্তু থেকে দান করাই উত্তম। অল্প সম্পদের অধিকারী কেউ যদি আন্তরিকতার সঙ্গে তার সামান্য প্রিয় বস্তু দান করেন, তাতেও আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা রয়েছে।
দান-সদকার জন্য সবার অঢেল সম্পদ থাকা জরুরি নয়। ধনী ব্যক্তি অর্থ-সম্পদ দিয়ে যেমন মানুষের উপকার করতে পারেন, তেমনি সীমিত সামর্থ্যের মানুষও খাবার, পোশাক, শ্রম, জ্ঞান, সময় কিংবা অন্য কোনো উপকারী কাজের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন।
অর্থাৎ দানের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের কল্যাণ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই কারও কাছে অঢেল সম্পদ না থাকলেও তার মানবিক দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, নিজের সামর্থ্য ও অবস্থান বিবেচনা করে অন্যের পাশে দাঁড়ানোই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দরিদ্র, এতিম, অসহায়, রোগাক্রান্ত ও বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া মানবিকতার বড় প্রকাশ।
দান করার ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। মানুষের প্রশংসা কিংবা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের জন্য দান করলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। তাই দান হওয়া উচিত নিঃস্বার্থভাবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।
একই সঙ্গে দানের সময় প্রাপকের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করাও জরুরি। এমনভাবে দান করা উচিত নয়, যাতে সাহায্যপ্রার্থী ব্যক্তি অপমানিত বা হেয় বোধ করেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে দান কেবল সম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার নাম নয়; বরং এটি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার প্রকাশ। নিজের প্রিয় সম্পদ থেকে অন্যের প্রয়োজন পূরণ করা মানুষের হৃদয়ে উদারতা সৃষ্টি করে এবং সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলে।
সুতরাং সম্পদ জমিয়ে রাখার প্রবণতার পরিবর্তে সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ভালো ও প্রিয় বস্তু থেকে দান করা এবং বিনিময়ে কোনো পার্থিব স্বীকৃতি প্রত্যাশা না করাই ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা সম্পদই প্রকৃত অর্থে কল্যাণকর সম্পদে পরিণত হয়।