
সিলেট বিভাগে হাম প্রতিরোধে সরকারের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় গত আড়াই মাসে ১৪ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চার জেলায় টিকাদানের হার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে এই সাফল্যের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। টিকাদান শুরুর পর থেকেই সংক্রমণ ও প্রাণহানির হার বেড়েছে বলে সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগে, অর্থাৎ ১৫ মার্চ থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত সিলেট বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪৫ জন এবং মারা যান পাঁচজন। কিন্তু ২০ এপ্রিল কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর থেকে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) পর্যন্ত নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৮১ জন এবং মারা গেছেন ১১১ জন।
তবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। তাদের দাবি, হাসপাতালে ভর্তি ও দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা আগের তুলনায় কমছে। পর্যাপ্তসংখ্যক শিশু টিকার আওতায় এলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হবে এবং সংক্রমণও নিয়ন্ত্রণে আসবে।
অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনো অনেক আক্রান্ত শিশু শনাক্তের বাইরে থাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা ও গ্রামাঞ্চলে অনেক রোগী চিকিৎসাসেবার বাইরে থাকছেন, ফলে তারা অজান্তেই অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সিলেট প্রোগ্রাম অফিসার ডা. মোহাম্মদ আমানত উল্লাহ বলেন, একজন হামে আক্রান্ত শিশু গড়ে ১৪ থেকে ১৬ জনের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তিনি জানান, শতভাগ টিকাদান সম্পন্ন হলেও সাধারণত প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষের শরীরে কার্যকর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। বাকি প্রায় ৫ শতাংশ ব্যক্তি বিভিন্ন কারণে ঝুঁকিতে থেকে যান।
দেশজুড়ে চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। সিলেট বিভাগে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ৪ এপ্রিল একসঙ্গে ৩০ জন আক্রান্তের তথ্য পাওয়া যায়। পরে পরিস্থিতির অবনতি হলে ২০ এপ্রিল থেকে সিলেটসহ সারাদেশে বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, সংক্রমণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিভাগে মোট ১১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১১০ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন এবং ছয়জনের ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭২৬ জন।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে সুনামগঞ্জে। জেলাটিতে আক্রান্ত ৩৪৬ জন এবং মারা গেছেন ৫১ জন। সিলেট জেলায় আক্রান্ত ২৪০ জন, মৃত্যু ৪০ জন। হবিগঞ্জে আক্রান্ত ৭৩ জনের মধ্যে ১২ জন এবং মৌলভীবাজারে ৬৭ জন আক্রান্তের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ চার জেলায় ১৩ লাখ ২৩ হাজার ৯৬৬ শিশাকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। মঙ্গলবার পর্যন্ত টিকা নিয়েছে ১৩ লাখ ৩২ হাজার ২০৮ শিশু, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ হাজার বেশি। সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬৮ হাজার ৯৩৩ জনের বিপরীতে টিকা পেয়েছে ৬৯ হাজার ১৭৮ শিশু। সব মিলিয়ে বিভাগজুড়ে টিকাপ্রাপ্ত শিশুর সংখ্যা ১৪ লাখ অতিক্রম করেছে।
সিলেটের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। আগে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচজন পর্যন্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তিনি আরও জানান, যেসব মা আগে হামের টিকা নেননি, তাদের নবজাতক শিশুরা এখনো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি দুর্গম অঞ্চল ও চা-বাগান এলাকায় টিকাদানের হার তুলনামূলক কম হওয়ায় সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকিও বেশি।