রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর প্রধান কার্যালয়ের সামনে রোববার (২০ এপ্রিল) দিনভর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করেছে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকদের দুই পক্ষ। এতে ব্যাংকটির গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে লেনদেন ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের ব্যানারে কয়েকশ ব্যক্তি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তারা চাকরি পুনর্বহাল এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ-এর নিয়ন্ত্রণ পুনর্বহালের দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্যায়ভাবে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
এ সময় শরিয়াহভিত্তিক বিভিন্ন ব্যাংক— ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক-এর চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মানববন্ধনে অংশ নেন।
বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, তাদের দ্রুত চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে এবং বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে আগের মালিকানায় ফেরত দিতে হবে। দাবি পূরণ না হলে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া একাধিক সাবেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ, অনিয়ম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাদের চাকরি হারাতে হয়েছে। তাদের ভাষ্য, ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতেই তারা এই আন্দোলনে নেমেছেন।
অন্যদিকে, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একই স্থানে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ‘গ্রাহক ও ভুক্তভোগী সমন্বয় পরিষদ’-এর ব্যানারে আরেকটি পক্ষ পাল্টা কর্মসূচি পালন করে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সামনে অবস্থান নিয়ে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তাদের প্রধান দাবি ছিল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেফতার, দেশের সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা।
এই গ্রুপের অভিযোগ, অতীতে প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের মালিকানা দখল করা হয়েছিল এবং ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা ব্যাংক রেজুলেশন আইনের কিছু ধারা বাতিল এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের ‘মব’ সৃষ্টির সুযোগ না দেওয়ারও দাবি জানান।
দুই পক্ষের কর্মসূচিকে ঘিরে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়, যা সরাসরি প্রভাব ফেলে গ্রাহকদের ওপর। সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক গ্রাহক ব্যাংকে এলেও আতঙ্কের কারণে লেনদেন না করেই ফিরে যান। কেউ কেউ সীমিত পরিসরে টাকা উত্তোলন করেছেন বলেও জানা গেছে।
গ্রাহকদের মধ্যে একজন জানান, পরিস্থিতি অনিশ্চিত মনে হওয়ায় তিনি লেনদেন না করে ফিরে গেছেন। আরেকজন উদ্যোক্তা বলেন, এ ধরনের পরিবেশ অব্যাহত থাকলে বিকল্প ব্যাংকে লেনদেন করার কথা ভাবতে হবে।
এদিকে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে নানা ইস্যু—বিশেষ করে ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ এবং পূর্ববর্তী নিয়োগ সংক্রান্ত বিতর্ক—নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটেই চাকরিচ্যুতদের আন্দোলন নতুন করে জোরালো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত যথাযথ কারণেই নেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তাই মালিকানা বা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের দাবি আদালতের এখতিয়ারাধীন, যা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে ব্যাংকের ভাবমূর্তি ও গ্রাহক আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সংযত আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে, মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের সামনে এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি দেশের ব্যাংকিং খাতে চলমান অস্থিরতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়