
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটালাইজেশন ও সবুজ প্রযুক্তির প্রসারে বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজারের চাহিদা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণকে (টিভেট) প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে বাংলাদেশ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সরাসরি সংযোগ স্থাপনে কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং শিল্পখাতের চাহিদাভিত্তিক জাতীয় ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বাংলাদেশের জাতীয় বক্তব্যে এসব কথা বলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
তিয়ানজিনের মেইজিয়াং কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে আয়োজিত সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘টিভেট: পরিবর্তনকে যৌথভাবে গ্রহণ, যৌথভাবে মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং যৌথভাবে ভবিষ্যৎ নির্মাণ’। এতে ৪০টিরও বেশি দেশের শিক্ষামন্ত্রী, ১০০টিরও বেশি দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল, ইউনেস্কোর প্রতিনিধি, শিল্পখাতের শীর্ষ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান এবং কারিগরি শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন।
জাতীয় বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ এ দেশের জনগণ। মানবসম্পদই জাতীয় অগ্রগতির মূল ভিত্তি। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থান, একাডেমিক জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগ এবং তরুণদের সম্ভাবনার সঙ্গে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক সুযোগের সেতুবন্ধন তৈরি করে।
ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চাহিদা পূরণে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক শিক্ষা যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহারিক, প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল দক্ষতার সমন্বয় প্রয়োজন। পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কারিগরি শিক্ষাকে আধুনিক করতে হবে।
এহছানুল হক মিলন বলেন, বাংলাদেশের টিভেট সংস্কার কার্যক্রম শুধু নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম তৈরি, পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিতে শিক্ষকদের দক্ষ করে তোলা, শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি এবং জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর সঙ্গে কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুযোগ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থাকে উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত করা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গত জুনে চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ওই সফরে দুই দেশ শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীনের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা খাতের আধুনিকায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পভিত্তিক ব্যবহারিক শিক্ষার প্রসারে কাজ করা হচ্ছে।
সম্মেলনের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তিনটি আহ্বান জানান শিক্ষামন্ত্রী। এগুলো হলো—উদীয়মান প্রযুক্তি ও পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও অভিযোজনক্ষম করা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বৈশ্বিক মানদণ্ডকে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা এবং সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত, নিয়োগদাতা, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও তরুণদের মধ্যে অংশীদারত্ব জোরদার করা।
সম্মেলনের ফাঁকে চীনের শিক্ষা উপমন্ত্রী রেন ইউছুয়েনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। বৈঠকে বাংলাদেশের বিদ্যমান কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, যৌথ কারিগরি শিক্ষা কর্মসূচি চালু এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনা সরকারি বৃত্তির সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশে ‘বাংলাদেশ-চীন যৌথ কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েও দুই পক্ষ আলোচনা করে। অগ্রাধিকারমূলক সহযোগিতার এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনের শিক্ষামন্ত্রী হুয়াই জিনপেং, দেশটির স্টেট কাউন্সিলের ভাইস প্রিমিয়ার দিং শুয়েশিয়াং, তিয়ানজিনের মেয়র ঝাং গং, মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আহমাদ জাহিদ হামিদি এবং ইউনেস্কোর ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।