
চীনের জনপ্রিয় ভিডিও প্ল্যাটফর্ম বিলিবিলি এবার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পরিসরে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক কনটেন্ট নির্মাতা ও দর্শকদের আকৃষ্ট করতে নতুন অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ চালুর পাশাপাশি ইংরেজি ভাষার ওয়েবসাইটও তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক ভিডিও স্ট্রিমিং বাজারে ইউটিউবের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে চাইছে চীনা এই প্ল্যাটফর্ম।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট বিলিবিলি আন্তর্জাতিক ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ চালু করেছে। শিগগিরই এর আইওএস সংস্করণও চালু হতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে।
আগে বিলিবিলির মূল প্ল্যাটফর্মে বিদেশি নির্মাতাদের কনটেন্ট তৈরি ও আপলোডের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্রের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করতে হতো। নতুন আন্তর্জাতিক সংস্করণে এই বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে।
বিলিবিলির আন্তর্জাতিক ও চীনা প্ল্যাটফর্মে মূলত একই ধরনের কনটেন্ট রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্মাতারা বিলিবিলির বিশাল চীনা দর্শকগোষ্ঠীর কাছে নিজেদের কনটেন্ট পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পাবেন। একইভাবে আন্তর্জাতিক দর্শকরাও চীনা প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট উপভোগ করতে পারবেন।
চীনা ভাষা না জানা ব্যবহারকারীদের জন্য প্ল্যাটফর্মটি আরও সহজলভ্য করতে ইংরেজি ভাষার ওয়েবসাইট তৈরির কাজ করছে বিলিবিলি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বিভিন্ন দেশেও কর্মী নিয়োগ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
লস অ্যাঞ্জেলেস, লন্ডন, মেক্সিকো সিটি, সাও পাওলো, ইস্তাম্বুল ও টোকিওতে কমিউনিটি-সংক্রান্ত বিভিন্ন পদে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের জন্য এআইভিত্তিক কনটেন্ট মডারেশন ব্যবস্থাও তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু দর্শক বাড়ানো নয়, কনটেন্ট নির্মাতাদের আয়ের সুযোগ তৈরিতেও গুরুত্ব দিচ্ছে বিলিবিলি। বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, লাইভস্ট্রিমিং, ফ্যান পেমেন্ট, ই-কমার্স ও পেইড কনটেন্টের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্মাতাদের সঙ্গে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের যোগাযোগ করিয়ে দিতে ‘স্পার্কেল’ নামে একটি বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্মও রয়েছে বিলিবিলির। এর মাধ্যমে স্পনসরড কনটেন্টসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলিবিলির ক্রিয়েটর ইনসেনটিভ নিয়ে প্রতি ১ হাজার ভিউয়ে প্রায় ৭০ সেন্ট দেওয়ার তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। তবে প্রতি ১ হাজার ভিউয়ের জন্য নির্দিষ্টভাবে ৭০ সেন্ট দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি বিলিবিলি। নির্মাতাদের প্রকৃত আয় ভিডিওর পারফরম্যান্স, দর্শকের সম্পৃক্ততা, কনটেন্টের মান ও বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
চীনে বিলিবিলির বর্তমান ক্রিয়েটর ইনসেনটিভ প্রোগ্রামে বেস ইনসেনটিভের পাশাপাশি বিজ্ঞাপন আয়ের অংশীদারত্ব রয়েছে। বেস ইনসেনটিভের সর্বোচ্চ সীমা মাসে ২ হাজার ইউয়ান বা প্রায় ২৮০ ডলার। তবে বিজ্ঞাপন থেকে পাওয়া আয়ের অংশীদারত্ব এই সীমার আওতাভুক্ত নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে একই কাঠামো কার্যকর হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
চীনে ইতোমধ্যে বড় দর্শকগোষ্ঠী তৈরি করেছে বিলিবিলি। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৭ কোটি ৬০ লাখের বেশি ছিল। দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ কোটি ৫২ লাখ।
একজন ব্যবহারকারী গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১১৯ মিনিট বিলিবিলিতে সময় কাটান। একই সময়ে প্ল্যাটফর্মটির বিজ্ঞাপন আয়ও বছরে ৩০ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জনপ্রিয় নির্মাতাদেরও প্ল্যাটফর্মটিতে আনতে চাইছে বিলিবিলি। এর মধ্যে মার্কিন জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা MrBeast-এর মতো তারকাদের চীনা প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট প্রকাশে উৎসাহিত করার উদ্যোগও রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ভিডিও দেখার ক্ষেত্রে ইউটিউবের অবস্থান এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত জায়গা করে নেওয়া বিলিবিলির জন্য সহজ হবে না।
দীর্ঘদিন ধরে ইউটিউব নির্মাতাদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞাপন আয়ের ব্যবস্থা তৈরি করেছে। দীর্ঘ ভিডিওর ক্ষেত্রে যোগ্য ওয়াচ-পেজ বিজ্ঞাপন থেকে পাওয়া আয়ের ৫৫ শতাংশ নির্মাতারা পান। তবে প্রকৃত আয় দর্শকের দেশ, বিজ্ঞাপনের চাহিদা ও কনটেন্টের ধরনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
অন্যদিকে বিলিবিলির বড় শক্তি হলো বিশাল চীনা দর্শকগোষ্ঠী এবং নির্মাতাদের জন্য একাধিক আয়ের সুযোগ। আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের সহজ নিবন্ধন, নতুন দর্শক এবং চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিতে পারলে প্ল্যাটফর্মটি অনেক নির্মাতার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিলিবিলিকে বিভিন্ন দেশে নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হতে পারে। কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ, সেন্সরশিপ ও ব্যবহারকারীর তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে টিকটকের অভিজ্ঞতার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোতে চীনা মালিকানাধীন প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলো বাড়তি নজরদারির মধ্যে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, বিলিবিলির আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও নতুন অ্যাপ, ইংরেজি ওয়েবসাইট, বিদেশে কর্মী নিয়োগ, সহজ নিবন্ধন এবং নির্মাতাদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ—সব মিলিয়ে ইউটিউবের বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার বড় প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের আকৃষ্ট করতে পারলে আগামী দিনে বৈশ্বিক ভিডিও প্ল্যাটফর্মের বাজারে ইউটিউবের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে বিলিবিলি।