
রংপুরে বাণিজ্যিকভাবে দ্রুত বাড়ছে উন্নত জাতের নেপিয়ার ঘাসের চাষাবাদ। খড় ও কৃত্রিম গো-খাদ্যের বিকল্প হিসেবে এটি এখন খামারিদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, ধান চাষের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি লাভ হওয়ায় অনেক কৃষক এখন ধান ছেড়ে ঘাস চাষে ঝুঁকছেন।
জেলার বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, একসময় যেখানে ধান বা ফসলি জমি ছিল, সেখানে এখন নেপিয়ার ঘাসের সবুজ বিস্তৃতি। দূর থেকে এসব জমি ধানক্ষেতের মতো মনে হলেও বাস্তবে এগুলো উন্নত জাতের ঘাসের আবাদ।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, এক একর জমিতে বছরে দুইবার ধান চাষ করে যেখানে প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাভ পাওয়া কঠিন, সেখানে নেপিয়ার ঘাস বছরে ৪ থেকে ৫ বার কেটে বিক্রি করে কয়েক গুণ বেশি আয় করা সম্ভব হচ্ছে।
বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের কৃষক মমদেল হোসেন বলেন, তিনি দুই বিঘা জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করে খামারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত ঘাস বিক্রি করছেন। এতে প্রতি বিঘায় বছরে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি আয় হচ্ছে, যা দিয়ে সংসার ও শিক্ষার খরচ মেটানো সহজ হয়েছে।
রংপুর সদর উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের কৃষক খয়বার আলী জানান, একবার ঘাসের চারা রোপণ করলে ৪ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। বছরে একাধিকবার কাটিং করা যায় এবং সার, পানি ও শ্রম খরচ তুলনামূলকভাবে কম।
পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, আগে বাজারের ভুসি ও খৈল কিনে খাওয়াতে গিয়ে খরচ বেড়ে যেত। এখন নিজের জমিতে ঘাস চাষ করায় গরুর খাবারের খরচ অর্ধেকের বেশি কমে গেছে এবং দুধ উৎপাদনও বেড়েছে।
স্থানীয় বাজারেও নেপিয়ার ঘাস এখন বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হচ্ছে। রংপুর নগরীর খামার মোড়ের ঘাস বিক্রেতা সবুর আলী জানান, তিনি কৃষকদের কাছ থেকে এক গোছা ঘাস ৪ টাকায় কিনে ৯ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি করেন। কোরবানির ঈদসহ বিশেষ সময়ে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের ডেইরি শিল্প টিকিয়ে রাখতে নেপিয়ার ঘাসের মতো উন্নত গো-খাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ও বেসরকারিভাবে এর চারা সহজলভ্য করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
মিঠাপুর ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আমজাদ সরকার বলেন, এই ঘাস দ্রুত বৃদ্ধি পায়, বছরে ৪ থেকে ৬ বার পর্যন্ত কাটা যায় এবং এতে প্রোটিন ও ফাইবার বেশি থাকায় গবাদিপশুর দুধ উৎপাদন ও শারীরিক বৃদ্ধি বাড়ে।
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নেপিয়ার ঘাস চাষের পরিমাণও বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে ১০৭ দশমিক ৪০ একর জমিতে চাষ হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১৩৭ দশমিক ৯০ একরের বেশি হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার মেট্রিক টন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নাজমুল হুদা বলেন, কৃত্রিম গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় খামারিরা নেপিয়ার ঘাসের দিকে ঝুঁকছেন। এটি খরচ কমানোর পাশাপাশি পশুর স্বাস্থ্য ও দুধ উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।