
হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম ইসলামের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় মাস। পবিত্র কোরআনে যেসব চারটি মাসকে বিশেষ সম্মানিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, মহররম তাদের অন্যতম। রমজানের পর এ মাসকেই সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ মাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মহররমকে ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ (তাহাজ্জুদ)।” (সহিহ মুসলিম: ২৬২৬)
অন্য এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেন, “রমজানের পর শ্রেষ্ঠ মাস হচ্ছে আল্লাহর মাস, যাকে তোমরা মহররম বলে থাক।” (সুনানে কুবরা: ৪২১৬)
এই হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, মহররম মাস বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলতের অধিকারী। এ মাসের সম্মান রক্ষার অন্যতম উপায় হলো নফল রোজার প্রতি যত্নবান হওয়া।
মহররম মাসের ১০ তারিখকে ‘আশুরা’ বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিভিন্ন হাদিসে এ দিনের রোজার বিশেষ ফজিলতের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, রমজানের পর কোন মাসে রোজা রাখা উত্তম? জবাবে তিনি বলেন, “তুমি যদি রমজানের পর রোজা রাখতে চাও, তাহলে মহররমে রোজা রাখ। কারণ এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন রয়েছে, যেদিন আল্লাহ অতীতে বহু মানুষের তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও বহু মানুষের তওবা কবুল করবেন।” (জামে তিরমিজি: ৭৪১)
হাদিস বিশারদদের মতে, এখানে আশুরার দিনের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মানুষ আশুরার দিন রোজা রাখত। এমনকি কাবা শরিফে নতুন গিলাফও এ দিনে পরানো হতো। পরে রমজানের রোজা ফরজ হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যে ইচ্ছা আশুরার রোজা রাখবে, আর যে ইচ্ছা রাখবে না।” (সহিহ বোখারি: ১৫৯২)
অর্থাৎ রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজা নফল ও মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখেন, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, এ দিন আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে সাগরে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন।
এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।” এরপর তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখতে উৎসাহিত করেন। (সহিহ মুসলিম: ১১৩০)
আশুরার দিনের রোজার বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের (সগিরা) গোনাহের কাফফারা হবে।” (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
উলামায়ে কেরামের মতে, আশুরার রোজার সঙ্গে মহররমের ৯ বা ১১ তারিখ মিলিয়ে রোজা রাখা উত্তম। এতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা হয় এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সাদৃশ্য এড়ানো যায়।
মহররম তাই শুধু হিজরি বছরের সূচনাই নয়, আত্মশুদ্ধি, তওবা, ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও বটে।