
জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা তুলে ধরে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন।
এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর চিঠি পাঠিয়েছে সংগঠনটি। বুধবার (১২ আগস্ট) সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিটি পাঠানো হয়।
পল্লী বিদ্যুতের একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে চিঠি পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘আমরা কিছুক্ষণ আগে চিঠি পেয়েছি। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ সবসময় সচেষ্ট রয়েছে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’
চিঠিতে বলা হয়, জ্বালানি সংকট ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। ফলে সরবরাহ কমে গেছে। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রামাঞ্চলে অতিরিক্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে এসব এলাকায় জনরোষ বাড়ছে এবং কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যুতের উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে হামলার ঘটনাও ঘটছে।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো। জাতীয়ভাবে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশও তাদের আওতাধীন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না; জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ পাওয়া বিদ্যুৎই গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, গত কয়েক দিনে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সম্মিলিত গড় চাহিদা ছিল প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে তারা গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছে। ফলে কোনো কোনো এলাকায় দিনে ৮, ১০ এমনকি ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও ক্ষুব্ধ মানুষ পল্লী বিদ্যুতের উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর করছে। এতে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে নিরাপত্তা জোরদারে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য আইজিপির কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
চিঠির অনুলিপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব, বিদ্যুৎ সচিবের একান্ত সচিব এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের একান্ত সচিবকে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সব জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ও জেনারেল ম্যানেজার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছেও অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
চলমান বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে গ্যাসের ঘাটতিকে উল্লেখ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে নতুন একটি কৌশলে কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আশা করা হচ্ছে বুধবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে।
সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটে জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ছে গ্রামাঞ্চলে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন এলএনজি খালাস করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালও এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে মালয়েশিয়ার সঙ্গেও সরকার আলোচনা করছে।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ থেকে একটি দল দেশটিতে গেছে। সেখান থেকে অন্তত একটি এলএনজি কার্গো পাওয়ার আশা করছে সরকার।
এ ছাড়া আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বিশেষায়িত এসব ট্যাংক সহজে পাওয়া যায় না বলে এটিকে তাৎক্ষণিক নয়, বরং মধ্যমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখছে সরকার।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের হাতে থাকা সব বিকল্প নিয়েই কাজ করা হচ্ছে।
আগের সরকারগুলোর জ্বালানি নীতির সমালোচনা করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ায় বর্তমান সংকটের ভিত্তি আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, ‘যখন ভুল নীতি আপনি গ্রহণ করবেন, একটি সময় তার মাসুল দিতে হবে।’
তবে বিদ্যুৎ স্থাপনার নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে পাঠানো চিঠিটি মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়নি বলেও স্পষ্ট করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা দেইনি।’