
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে তফসিল ঘোষণা এবং নভেম্বরে ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অতীতের সহিংসতার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবার শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কমিশন।
সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবে ইসি। এরই মধ্যে পুলিশ, আনসার ও বিজিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন।
গত ১৮ আগস্ট আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে নিজ দপ্তরে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের সঙ্গে বৈঠক করেন সিইসি। বৈঠকে সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন চাওয়া হয়।
বৈঠক শেষে আইজিপি আলী হোসেন ফকির জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা কমিটির সমন্বয় সেল গঠন এবং বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার পরিস্থিতি নিয়েও কথা হয়েছে। শিগগিরই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতিবেদন ইসিকে দেওয়া হবে।
এরপর গত ২৭ আগস্ট নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিইসি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে কমিশনের অঙ্গীকারে কোনো ঘাটতি নেই। জাতীয় নির্বাচন যেভাবে করা হয়েছে, তার চেয়েও ভালো নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করা হবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় সহিংসতার মাত্রা কিছুটা বেশি থাকে। বিষয়টি কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠে মোতায়েনের চেষ্টা করা হবে।
সিইসি আরও জানান, সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচনের সময় পুলিশ কী পরিমাণ সদস্য দিতে পারবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পুলিশের বিদ্যমান মনিটরিং ব্যবস্থাও নির্বাচনের সময় মাঠ পর্যবেক্ষণে ব্যবহারের জন্য চাওয়া হয়েছে।
এর আগে ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক এবং ২৪ আগস্ট বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালকের সঙ্গেও বৈঠক করেন সিইসি। এসব বৈঠকেও নির্বাচন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, সিইসি পুলিশ, আনসার ও বিজিবির সঙ্গে প্রাথমিকভাবে বৈঠক করেছেন। শিগগিরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করা হবে। সেখানে তাদের মতামত নেওয়ার পাশাপাশি কীভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন আইনে পরিবর্তন এলেও এবার নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা নেই। পুলিশ, আনসার ও বিজিবিকেই যথেষ্ট মনে করছে কমিশন। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সহায়তা নেওয়া হতে পারে।
ইউপি নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সহিংসতার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। অতীতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ব্যাপক সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচন কমিশন ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা ও প্রাণহানি ঘটে। ওই নির্বাচনে ২৩৬ জন নিহত এবং আট হাজারের বেশি মানুষ আহত হন।
এরপর ২০২১ সালে ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচন ঘিরে সংঘর্ষ ও সহিংসতায় ১১৬ জন প্রাণ হারান বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জরিপে উঠে আসে। শুধু ২০২১ সালেই ইউপি নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় ১১৩ জন নিহত হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৬ ও ২০২১ সালের ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের কারণে সহিংসতা বেড়েছিল। একই দলের বিদ্রোহী ও মূল প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, ব্যালট ছিনতাই, কেন্দ্র দখল এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ঘটনাও সহিংসতার অন্যতম কারণ ছিল।
এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় সহিংসতা তুলনামূলক কম হতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলেন, বিগত নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের কারণে সহিংসতা ও প্রাণহানি বেশি হয়েছিল। এবার দলীয় প্রতীক না থাকায় সহিংসতা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
তবে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিলে তাকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে প্রতিহত করার চেষ্টা থেকে সহিংসতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কমিশন উদ্বিগ্ন নয়। ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন করা হবে, ফলে সব জায়গায় একসঙ্গে ভোট হবে না। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হবে।
তিনি বলেন, সবাই সংঘাতমুক্ত নির্বাচন চায় এবং কমিশনও সে লক্ষ্যেই কাজ করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয়কে কমিশন বিবেচনায় নেয় না। কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট পদে প্রার্থী হওয়ার আইনগত যোগ্যতা পূরণ করলে তিনি প্রার্থী হতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, সংঘাতমুক্ত নির্বাচন আয়োজনের পথে যেসব বাধা আসতে পারে, সেগুলোই কমিশনের কাছে চ্যালেঞ্জ। মানুষের কাছ থেকে পাওয়া আশঙ্কা ও সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিস্থিতি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
‘শতভাগ নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো এলাকায় মাত্র পাঁচ শতাংশ ঝুঁকির আশঙ্কা থাকলেও সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তার ভাষ্য, নির্বাচন ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিগত বিরোধ ও স্থানীয় নানা ধরনের গণ্ডগোল থাকে। অনেক সময় এসব বিরোধ নির্বাচনের সুযোগ নিয়ে সংঘাতে রূপ নেয়। তাই সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই ইউপি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।