
একসময় জলাতঙ্কের কথা উঠলেই কুকুরের কামড়ের বিষয়টি সামনে আসত। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। বর্তমানে কুকুরের পাশাপাশি বিড়ালের কামড় ও আঁচড় থেকেও উল্লেখযোগ্য হারে জলাতঙ্কের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে পোষা বিড়ালের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতিও উদ্বেগ তৈরি করছে।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন নিতে আসা রোগীদের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশই বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছর গড়ে সোয়া লাখ মানুষ র্যাবিসের ভ্যাকসিন গ্রহণ করেন। অন্যদিকে দেশে প্রতিবছর গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের মৃত্যু হয় জলাতঙ্কে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের তথ্যও বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পোষা প্রাণী, বিশেষ করে বিড়াল উদ্ধারের জন্য তাদের কাছে ফোনকলের সংখ্যা বেড়েছে।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে কুকুর, বিড়াল, বেজি, বানর ও শিয়ালের আক্রমণে আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৮৯ হাজার ৯২৮ জন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪ হাজার ৩৮০ জনে। ২০২৪ সালে তা আরও বেড়ে হয় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ জন। ২০২৫ সালে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জন। আর ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে ওই হাসপাতালে র্যাবিস ভ্যাকসিন নিয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫১ জন।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের প্রথম চার মাস পর্যন্ত জলাতঙ্কে মৃত্যু হয়েছে ১৭৮ জনের। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন, ২০২৫ সালে ৫৯ জন এবং ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ১৯ জন মারা গেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৫ সালে জলাতঙ্কে ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৬ সালে ৬৬ জন, ২০১৭ সালে ৮০ জন, ২০১৮ সালে ৫৭ জন, ২০১৯ সালে ৫৭ জন, ২০২০ সালে ২৬ জন, ২০২১ সালে ৪০ জন এবং ২০২২ সালে ৪৫ জনের মৃত্যু হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে দেড় শতাধিক মানুষ অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন নিতে আসেন। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই বিড়ালের দ্বারা আক্রান্ত। আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু রয়েছে। এসব বিড়ালের বড় একটি অংশ পোষা বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি ঢামেক হাসপাতালের টিকাকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ের পর ভ্যাকসিন নিতে এসেছেন। যাত্রাবাড়ী থেকে আসা সামিয়া নামে এক শিশুকে তার পোষা বিড়াল পায়ে কামড় দেওয়ার পর হাসপাতালে আনা হয়। তবে এ ঘটনার পরও বিড়াল পোষা বন্ধ করতে রাজি নয় সে। তার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, বিড়ালটি সামিয়ার সার্বক্ষণিক সঙ্গী।
ঢামেক হাসপাতালের টিকাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী এক নার্স জানান, বর্তমানে টিকা নিতে আসা মানুষের বড় একটি অংশ বাসার পোষা বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত। অনেকেই শখ করে বিড়াল পালন করলেও প্রাণীকে সময়মতো টিকা দেওয়ার বিষয়ে সচেতন নন। গত তিন থেকে চার বছরে বিড়ালের মাধ্যমে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ র্যাবিসের টিকা নিতে আসছেন। তাদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিড়ালের মাধ্যমে আক্রান্ত, বাকিদের বেশিরভাগ কুকুরের কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত।
তিনি বলেন, জলাতঙ্ক একটি প্রাণঘাতী রোগ। বিড়াল, কুকুর, বেজি ও শিয়ালের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে এ রোগ ছড়াতে পারে। অনেকেই সামান্য আঁচড় বা কামড়কে গুরুত্ব দেন না এবং সময়মতো প্রতিষেধক নেন না। এতে ঝুঁকি বাড়ে। কামড় বা আঁচড়ের পর যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতস্থান সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভ্যাকসিন নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ পেতে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে। তবে কখনো এক সপ্তাহের মধ্যেও লক্ষণ দেখা দিতে পারে, আবার এক বছর পরও প্রকাশ পেতে পারে। লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তবে সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও প্রতিষেধক গ্রহণ করলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এদিকে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পোষা প্রাণী, বিশেষ করে বিড়াল উদ্ধারের জন্য তাদের কাছে অনেক ফোনকল আসছে। যদিও পোষা প্রাণী উদ্ধার করা ফায়ার সার্ভিসের নিয়মিত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না, তবুও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাদের উদ্ধার অভিযানে যেতে হয়।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৫৫৫টি পোষা পাখি ও প্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৪ সালে ৫৮০টি, ২০২৩ সালে ৩৪৭টি এবং ২০২২ সালে ৫৩০টি পোষা পাখি ও প্রাণী উদ্ধার করা হয়।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের অতিরিক্ত সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) শাজাহান বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পোষা প্রাণী, বিশেষ করে বিড়াল উদ্ধারের জন্য ফায়ার সার্ভিসের কাছে অনেক ফোনকল আসছে। এসব ফোনকল থেকে ধারণা করা যায়, মানুষের মধ্যে পোষা প্রাণী পালনের প্রবণতা বেড়েছে।
সমাজ বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা পরিবর্তনের কারণে শহুরে মানুষের মধ্যে পোষা প্রাণী পালনের আগ্রহ বাড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে শহুরে মানুষের মধ্যে একাকিত্ব বেড়েছে। সেই শূন্যতা পূরণে অনেকে পোষা প্রাণীকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ঘনবসতিপূর্ণ শহরে তুলনামূলক কম জায়গা ও খরচে বিড়াল পালন করা যায় বলে এর জনপ্রিয়তাও বেশি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বিড়াল অন্যতম জনপ্রিয় পোষা প্রাণী। তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ৭ কোটি ৪২ লাখের বেশি পোষা বিড়াল রয়েছে। চীনে রয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৩১ লাখ এবং রাশিয়ায় প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ। তবে বাংলাদেশে মোট কতসংখ্যক পোষা বিড়াল রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
প্রতি বছর ৮ আগস্ট বিশ্ব বিড়াল দিবস পালন করা হয়। তবে বিড়াল পালনের পাশাপাশি পোষা প্রাণীর টিকাদান ও কামড়-আঁচড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।