
দাতা সংস্থাগুলো আবারও বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপানের জাইকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ইউএসএআইডির মতো বড় উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশে নতুন করে অর্থায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
জনসংখ্যার সম্ভাবনা, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বড় বাজার, জলবায়ু ঝুঁকি এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করেই দাতা সংস্থাগুলোর এই আগ্রহ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ২০২৬ সালে এসে বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের প্রতিশ্রুতি ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
২০২৬ সালে বিভিন্ন দাতা ও ঋণদাতা সংস্থার প্রতিশ্রুত অর্থের মধ্যে বিশ্বব্যাংক প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। জলবায়ু অভিযোজন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এই অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা।
এডিবি দেবে প্রায় ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা অবকাঠামো, জ্বালানি ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
জাইকা দেবে প্রায় ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ মেট্রোরেল, বন্দর ও কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় হবে।
এ ছাড়া আইএমএফের কাছ থেকে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, ইইউ থেকে ৭০০ মিলিয়ন ইউরো এবং ইউএসএআইডি থেকে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে দাতা ও ঋণদাতা সংস্থাগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েকটি কারণে বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশে বড় ধরনের অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। ফলে অনুদানের পাশাপাশি স্বল্প সুদের ঋণ ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে দাতা সংস্থাগুলো আগ্রহী।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠী, তরুণ জনশক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে আকর্ষণীয়।
চতুর্থত, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও দাতা সংস্থাগুলোর আগ্রহ বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে আগামী অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে আবার বাংলাদেশে আসছে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রতিনিধি দলটি প্রায় ১০ দিন বাংলাদেশে অবস্থান করবে। মূলত ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির পঞ্চম কিস্তি ছাড়ের আগে নির্ধারিত শর্তগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা পর্যালোচনা করবে তারা।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দেওয়ার অনুমোদন দেয় আইএমএফ। সাত কিস্তিতে এই ঋণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে চার কিস্তিতে প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে। পঞ্চম কিস্তিতে প্রায় ৬৮ কোটি ডলার পাওয়ার কথা।
প্রতিনিধি দলটি রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, জ্বালানি ভর্তুকি কমানো, স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়, ব্যাংক খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ কমানো, বিনিময় হার ও বাজারভিত্তিক ডলারের দাম, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে।
একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির বিভিন্ন দিক নিয়েও সরকারের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে।
নতুন ঋণ পাওয়ার পাশাপাশি পুরোনো বিদেশি ঋণ পরিশোধেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে সরকার।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে সরকার বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা।
ইআরডির তথ্য বলছে, কোনো পাঁচ মাসের ব্যবধানে বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ পরিমাণ। গত বছরের একই সময়ে পরিশোধ করা হয়েছিল ১৮৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরিশোধ বেড়েছে ১৫ কোটি ৪ লাখ ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ঋণের আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ১৩৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার এবং সুদ বাবদ ৬৯ কোটি ৫২ লাখ ডলার। অর্থাৎ এই পাঁচ মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪১ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশ নতুন বৈদেশিক ঋণ পেয়েছে ১৮০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে আগের নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করেছে ৪৫৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ জুলাইয়ে নতুন করে পাওয়া ঋণের চেয়ে প্রায় ২৭৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার বেশি পরিশোধ করেছে সরকার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ, আর নতুন ঋণের অর্থছাড় কমেছে ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন ঋণ পাওয়ার পাশাপাশি সরকারের পুরোনো ঋণের চাপও বাড়ছে। দেশি ও বিদেশি—উভয় ধরনের ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বাড়ছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে এবং এর সঙ্গে সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। তার মতে, ঋণ পরিশোধ এখন সরকারের অন্যতম বড় ব্যয়ের খাতে পরিণত হয়েছে এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যে ঋণ পরিশোধে নতুন করে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের প্রতি দাতা সংস্থাগুলোর নতুন করে আগ্রহ দেখানোকে তিনি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। এক বছরে এই ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে গত মার্চ শেষে সরকারের বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ৯১ বিলিয়ন ডলার। প্রতি ডলার ১২৫ টাকা ধরে হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। ফলে দেশি-বিদেশি ঋণ মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক হিসাবে দেখা যায়, গত অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার নিট ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৭৭ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ৫৪ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দাতা সংস্থাগুলোর নতুন অর্থায়ন দেশের উন্নয়ন ও সংস্কারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বিবেচনায় নতুন ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক সুফল এবং ভবিষ্যৎ পরিশোধ সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।