গাজার যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের গল্প এবার উঠে আসছে সুই-সুতার শিল্পে। ফিলিস্তিনি নারীদের তৈরি ব্যতিক্রমধর্মী শিল্পকর্ম ‘গাজা জেনোসাইড ট্যাপেস্ট্রি’ প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্পমেলা ভেনিস বিয়েনালে-তে।
এই বিশাল ট্যাপেস্ট্রিতে গাজার যুদ্ধ, মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের নানা চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ফিলিস্তিন, লেবানন ও জর্ডানের শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত ফিলিস্তিনি নারীরা এটি তৈরি করেছেন। ১০০টি সূচিকর্মের প্যানেলে প্রায় ৫৫ হাজার সেলাইয়ের মাধ্যমে তারা গাজার ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি তুলে ধরেছেন।
প্রকল্পটির সহ-কিউরেটর ফিলিস্তিনি সাংবাদিক জেহান আলফারা বলেন, গাজায় চলমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করা অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেই সীমাবদ্ধতা থেকেই শিল্পভিত্তিক এ উদ্যোগের জন্ম।
তিনি জানান, যুদ্ধের শুরুতে একটি বুলডোজারের মাধ্যমে অজ্ঞাত মরদেহ গণকবরে দাফনের দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে— কীভাবে একটি জাতির হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো সংরক্ষণ করা যায়।
‘গাজা জেনোসাইড ট্যাপেস্ট্রি’ মূলত পুরস্কারপ্রাপ্ত প্যালেস্টাইন হিস্ট্রি ট্যাপেস্ট্রি প্রজেক্ট-এর নতুন অধ্যায়। গাজায় জন্ম নেওয়া ডিজাইনার ইব্রাহিম মুহতাদি ও সাংবাদিক জেহান আলফারা যৌথভাবে এ প্রকল্পে কাজ করছেন।
প্রতিটি প্যানেলে গাজার বিভিন্ন বাস্তব দৃশ্য ফুটে উঠেছে। কোথাও যুদ্ধাহত শিশু, কোথাও ধ্বংসস্তূপের পাশে কান্নারত মানুষ, আবার কোথাও খাদ্যের জন্য অপেক্ষমাণ বাস্তুচ্যুত পরিবারকে তুলে ধরা হয়েছে।
এই ট্যাপেস্ট্রিকে ফিলিস্তিনি জনগণের এক ধরনের ‘জাতীয় আর্কাইভ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্মাতাদের মতে, এটি এমন এক দলিল যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেবে গাজায় কী ঘটেছিল এবং কারা সেই ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছিল।
প্রকল্পটিতে ব্যবহার করা হয়েছে ফিলিস্তিনিদের শতাব্দীপ্রাচীন সূচিকর্মশিল্প ‘তাতরিজ’। ইউনেসকো ২০২১ সালে এ শিল্পকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
১৯৪৮ সালের নাকবার পর থেকে তাতরিজ ফিলিস্তিনি পরিচয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে এটি শুধু ঐতিহ্য নয়, বরং যুদ্ধ ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব সাক্ষ্য হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
লেবাননের আইন এল-হিলওয়ে শরণার্থী শিবিরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নারীরা এ প্রকল্পে অংশ নিয়েছেন। তাদের অনেকেই জানান, সূচিকর্ম শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং নিজেদের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা প্রকাশেরও একটি উপায়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুই-সুতার প্রতিটি নকশায় তারা নিজেদের বেদনা, আশা ও সংগ্রামের গল্প তুলে ধরেছেন।
আগামী ৯ মে থেকে ভেনিসের পালাজ্জো মোড়ায় ‘গাজা–নো ওয়ার্ডস–সি দ্য এক্সিবিট’ শিরোনামে এই প্রদর্শনী শুরু হবে। নভেম্বর পর্যন্ত চলবে প্রদর্শনীটি।
জেহান আলফারা বলেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক মঞ্চে ফিলিস্তিনি নারীদের কাজ প্রদর্শিত হওয়া গর্বের বিষয় হলেও এটি একই সঙ্গে একটি বড় বৈপরীত্যও তুলে ধরে। কারণ বিশ্ব গাজায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সম্পর্কে অবগত হলেও সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
তার ভাষায়, “ফিলিস্তিনি নারীরা এখনও গল্প বলে চলেছেন। তারা এখনও জবাবদিহি দাবি করছেন।”
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়