
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার এক ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে পুশইন করার অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় পুলিশের বিরুদ্ধে। আব্দুল রহিম (৩৭) নামের ওই ব্যক্তিকে আটক করে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম)।
ঘটনার প্রতিকার চেয়ে গত ৮ অক্টোবর ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে সংগঠনটি। অভিযোগপত্রের একটি অনুলিপি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে বলে জানানো হয়েছে।
মাসুমের অভিযোগ অনুযায়ী, আব্দুল রহিম পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ মহকুমার ভাটোল গ্রাম পঞ্চায়েতের কুইলারা অনন্তপুর এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম লাল মোহাম্মদ।
অভিযোগে বলা হয়, আব্দুল রহিম ধান ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে নিজ এলাকায় বসবাস করতেন। তার পরিবারের দাবি, তাদের কাছে আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড ও রেশন কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি নথি রয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, গত ২ জুন রাত ১১টার দিকে পুলিশ, বিএসএফ ও সিভিক পুলিশ সদস্যদের একটি দল আব্দুল রহিমের বাড়িতে যায়। সে সময় তাকে বাড়িতে না পেয়ে তার বড় ছেলে আবু কালামকে (প্রায় ২৬ বছর) আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়।
মাসুমের অভিযোগ, আবু কালামকে আটকের সময় পরিবারের হাতে কোনো গ্রেফতারি মেমো দেওয়া হয়নি এবং আটকের আইনগত কারণও স্পষ্ট করা হয়নি।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পরদিন ৩ জুন আব্দুল রহিমের বাবা লাল মোহাম্মদ, চাচা সিরাজুল হক, ভাটোল গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান ইউসুফ, পঞ্চায়েত সদস্য নাইয়েম আকতারসহ স্থানীয় কয়েকজন আবু কালামের মুক্তির জন্য ভাটোল পুলিশ ফাঁড়িতে যান।
সেখানে পুলিশ আব্দুল রহিমকে হাজির করতে বললে তিনি নিজেই পরিচয়পত্র নিয়ে তাদের সঙ্গে পুলিশ ফাঁড়িতে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাসুমের দাবি, পুলিশ সেখানে আব্দুল রহিমের আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড, রেশন কার্ডসহ বিভিন্ন নথি নিয়ে নেয়। তবে এসব নথি জব্দের কোনো তালিকা বা রসিদ দেওয়া হয়নি।
এরপর পরিচয় যাচাইয়ের পর তাকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সুযোগ না দিয়ে পুলিশ লকআপে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
মাসুমের অভিযোগ অনুযায়ী, আটকের পর ভাটোল পুলিশ প্রথমদিকে আব্দুল রহিমকে আটক করার বিষয়টি অস্বীকার করে। তবে পরবর্তী সময়ে তার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে আব্দুল রহিমের ফোনকল পেয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংগঠনটি দাবি করেছে, পরবর্তীতে আব্দুল রহিমকে কোনো আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনায় তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, আইনগত অধিকার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে তারা।
মাসুমের সেক্রেটারি কিরিটি রায় বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কোনো বৈধ আদেশ বা আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে তা গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ তৈরি করে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, কেউ বিদেশি নাগরিক হলেও যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে বহিষ্কার করা যায় না।
এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুই দেশের সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কূটনৈতিক পর্যায়ে নানা উদ্যোগের কথাও আলোচনায় রয়েছে।
এর মধ্যেই ভারতীয় নাগরিক হিসেবে পরিচিত একজনকে বাংলাদেশে পুশইনের অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এবার যদি ভারতীয় নাগরিককেই বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর।
তার মতে, এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকলে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তবে আব্দুল রহিমকে বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা ঘটনাটির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।