
দেশে ক্রমাগত কমছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন। এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করেও চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে শিল্প খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ আপাতত না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গত ১৪ জুলাই বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)-এর চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছে, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) সীমিত সক্ষমতার কারণে বর্তমানে শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ বিবেচনা করা হচ্ছে না।
বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। তবে একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় এখন ৫০ কোটি ঘনফুটেরও কম গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। ফলে গত এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ, শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, গত এক দশকে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি কমেছে। ২০১৭ সালে দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। এরপর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও বিদ্যমান অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যায়। তবে চাহিদা এর চেয়ে বেশি হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও সার কারখানাগুলোতে নিয়মিত গ্যাসের সংকট দেখা দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, শিল্পে নতুন সংযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত সাময়িক। গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সরকার একাধিক বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। ভোলার গ্যাস ঢাকায় আনার উদ্যোগ, মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির সম্ভাবনা এবং নতুন সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরির বিষয়ে আলোচনা চলছে। সরবরাহ বাড়ার পর অগ্রাধিকারভিত্তিতে নতুন সংযোগ দেওয়া হবে। যারা আগে অনুমোদন নিয়ে ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দিয়েছেন, তারা অগ্রাধিকার পাবেন।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, গ্যাস সরবরাহ দ্রুত বাড়াতে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে ১০০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সমুদ্র ও স্থলভাগে নতুন তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। পাশাপাশি নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তবে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, কূপ খনন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে নতুন সংযোগ দেওয়ার উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন পাওয়ার পর বিনিয়োগ করেছে, তাদের দীর্ঘদিন অপেক্ষায় রাখলে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হবে। তার মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের পাশাপাশি আমদানি বাড়ানোর অবকাঠামোও দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে, কারণ বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক বিকল্প নেই।