
শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছেন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষকরা। বাড়িতে বসে অ্যাসাইনমেন্ট বা রচনা লেখার পরিবর্তে শ্রেণিকক্ষে খাতা-কলমে লেখা, মৌখিক পরীক্ষা এবং হাতে-কলমে সৃজনশীল কাজের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জেনারেটিভ এআইয়ের ব্যাপক বিস্তারের ফলে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও শেখার দক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের অনেক শিক্ষক প্রযুক্তিনির্ভর কাজ কমিয়ে সরাসরি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা যাচাইয়ের পদ্ধতি বেছে নিচ্ছেন।
সান ফ্রান্সিসকোর একটি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির মানবিক বিভাগের শিক্ষিকা ট্রিস্টেন চ্যাং বাড়িতে বসে রচনা বা অনুচ্ছেদ লেখার প্রচলিত পদ্ধতি বাদ দিয়ে মৌখিক পরীক্ষা চালু করেছেন। শিক্ষার্থীদের কোনো লেখা মুখস্থ বা এআইয়ের সাহায্যে তৈরি করার সুযোগ না দিয়ে চরিত্র, পটভূমি ও মূলভাব নিয়ে ১৫টি প্রশ্ন করেন তিনি। মাত্র পাঁচ মিনিটের এই পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের নিজস্ব বোঝাপড়া যাচাই করা হয়।
একই শহরের জুনিয়র হাইস্কুলের ইংরেজি শিক্ষক রাসটি শেব মনে করেন, অভিভাবক বা শিক্ষকের চাপের মুখে পড়লেই অনেক শিক্ষার্থী বাড়িতে কাজ শেষ করতে এআইয়ের সাহায্য নেয়। এ প্রবণতা ঠেকাতে তিনি সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একটি রচনা লেখার জন্য শ্রেণিকক্ষেই পুরো এক মাস সময় দিচ্ছেন।
নিউইয়র্কের একটি হাইস্কুলের গণিত শিক্ষক ববসন ওয়াংও বাড়ির কাজ কমিয়ে শ্রেণিকক্ষে অনুশীলনের সুযোগ বাড়িয়েছেন। এতে শিক্ষার্থীরা কীভাবে নিজেরা অঙ্ক সমাধান করছে, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন তিনি।
এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে শিক্ষকদের কেউ কেউ নিচ্ছেন আরও কঠোর পদক্ষেপ। নিউইয়র্ক শহরতলির একটি হাইস্কুলের ইংরেজি শিক্ষিকা মেগান হাইল্যান্ড লক্ষ্য করেন, শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ থাকলেও কিছু শিক্ষার্থী এআই ব্যবহারের জন্য বাথরুমে যাচ্ছে। এরপর থেকে বাথরুমে যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের ফোন জমা রাখার নিয়ম চালু করেন তিনি।
ব্রঙ্কসের ইংরেজি শিক্ষক পিয়ান রকফেল্ড আবার প্রচলিত ও সহজে অনুমান করা যায়—এমন প্রশ্নের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের জন্য ভিন্নধর্মী কাজ তৈরি করছেন। তিনি এমন বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে দেন, যেখানে শিক্ষার্থীদের অর্থ দিয়ে পড়তে হয় এমন গবেষণাপত্র বা বিশেষায়িত উৎসের তথ্য ব্যবহার করতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের সুযোগ বাড়ে।
শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল যন্ত্রের ব্যবহার কমিয়ে খাতা-কলমে ফেরার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। শিকাগোর শহরতলির হাইস্কুল শিক্ষক রেক্স ওভাল শিক্ষাবর্ষের প্রায় ৯০ শতাংশ দিনই ক্রোমবুক বা ল্যাপটপ ব্যবহার বন্ধ রাখেন। শিক্ষার্থীদের হাতে লিখে কাজ করতে উৎসাহিত করেন তিনি। তার মতে, ল্যাপটপ দূরে রাখায় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বেড়েছে এবং এআইয়ের সাহায্যে কাজ করার সুযোগ কমেছে।
পাঠ মূল্যায়নে সৃজনশীলতা বাড়াতেও নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করছেন শিক্ষকরা। মেগান হাইল্যান্ড ‘এ টেল অব টু সিটিজ’ উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীদের রান্নার প্রদর্শনীর মতো সরাসরি অংশগ্রহণমূলক কাজ দিচ্ছেন। এতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব সময়ে নিজেদের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও বিষয়বস্তুর বোঝাপড়া তুলে ধরতে পারে।
শিক্ষায় এআইয়ের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় অবশ্য মিশ্র ফল পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষভাবে তৈরি এআই টিউটর ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের শেখার মান ও আগ্রহ বাড়তে পারে। অন্যদিকে, একই বছর এমআইটি মিডিয়া ল্যাবের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটির সাহায্যে কাজ দ্রুত শেষ করা গেলেও শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও মানসিকভাবে বিষয়টি অনুধাবনের প্রবণতা কমতে পারে।
র্যান্ডের জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এবং গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক পড়াশোনায় এআই ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। তবে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষাবিদ আন্তেরো গার্সিয়ার মতে, শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের প্রকৃত প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি।
তবে সব শিক্ষকই এআইকে শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে রাখার পক্ষে নন। নিউইয়র্কের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক মাইকেল জাগারি শিক্ষার্থীদের পাঠদক্ষতা অনুযায়ী ঐতিহাসিক শব্দের অর্থ সহজ করা এবং বড় নিবন্ধ সংক্ষিপ্ত করতে এআই ব্যবহার করেন। গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়েও তিনি শিক্ষার্থীদের এআইয়ের সহায়তা নিতে উৎসাহিত করেন। তাঁর মতে, এআইকে সঠিক নির্দেশনা দেওয়ার প্রক্রিয়াও শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।
জাগারির বক্তব্য, ইন্টারনেট ব্যবহারের মতো এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল হতে শেখানো জরুরি। কারণ, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই এআইকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলার পরিবর্তে এর সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানোই হতে পারে শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।