
দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। অথচ চাহিদা এর অর্ধেকের কাছাকাছি উঠলেই তা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ খাত। গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি, পায়রা ও আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্র পর্যাপ্ত সময় চালানোর মতো আর্থিক সক্ষমতার অভাবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ফলে সারা দেশেই লোডশেডিং বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ। বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির কারণে আপাতত বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কম থাকলেও গরম বাড়লে পরিস্থিতি আরও নাজুক হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দিবাগত রাত ১টায় দেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাবে, সোমবার ২৪ ঘণ্টায় দেশে বিদ্যুতের গড় চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৪০৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গড়ে ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।
অঞ্চলভেদে সবচেয়ে বেশি ৫৪৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে ঢাকা অঞ্চলে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে কোনো লোডশেডিং ছিল না। তবে ঘণ্টার হিসাবে সিলেট, ময়মনসিংহ ও খুলনা অঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হয়েছে।
এর আগের দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট এবং ৩ আগস্ট ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ আগস্টের শুরু থেকেই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।
মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল। গত ২১ জুলাই মহেশখালীর ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে দুর্ঘটনার দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৪৮৮ মেগাওয়াট। সে তুলনায় সর্বশেষ সর্বোচ্চ লোডশেডিং সাত গুণেরও বেশি।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকটের মূল কারণ জ্বালানি, টাকা ও ডলারের ঘাটতি। দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও সেগুলো চালানোর মতো পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা ও তেল নেই।
অন্যদিকে ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্র বেশি সময় চালালে পিডিবির লোকসান ও সরকারের ভর্তুকি আরও বাড়বে। দীর্ঘদিনের বকেয়ার কারণে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি কেনার সক্ষমতাও চাপে পড়েছে।
এর মধ্যেই গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তারপরও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া পরিশোধ করতে পারছে না পিডিবি।
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমান চাহিদা সাধারণত ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করছে। অথচ এর মধ্যেই চলছে লোডশেডিং।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি এখনো গ্যাস। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে এর বড় অংশই ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
কিছুদিন আগেও গ্যাস থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। এখন তা কমে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটে নেমেছে।
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।
দুর্ঘটনার আগে দেশে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। টার্মিনালটি বন্ধ হওয়ার পর তা প্রায় ২১৪ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। পরে টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হওয়ায় সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দুর্ঘটনার আগে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেলেও সংকটের মধ্যে তা কমে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। ফলে তুলনামূলক সাশ্রয়ী গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় অংশ অলস রাখতে হচ্ছে।
মহেশখালীর টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হওয়ার আগেই নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে আরেকটি এলএনজি টার্মিনালে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমদানি করা একটি এলএনজি চালান সামিটের ভাসমান টার্মিনালে নির্ধারিত সময়ে যুক্ত হতে পারেনি।
ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আবার কমেছে। কয়েক দিন ধরে দৈনিক প্রায় ২৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হলেও তা আবার প্রায় ২১০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। চালানটি টার্মিনালে যুক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহ ধরে রাখার অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। তবে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট।
পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট ২ আগস্ট থেকে রক্ষণাবেক্ষণে যাওয়ায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গিয়েছিল। পরে ইউনিটটি চালু করে ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। তবে কেন্দ্রটির বিপুল বকেয়া থাকায় সময়মতো বিল পরিশোধ না হলে ভবিষ্যতে কয়লা সরবরাহে ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
পটুয়াখালীর আরেকটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাস ও পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। সমুদ্রে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা স্থানান্তরে বিলম্ব হওয়ায় উৎপাদন কমেছে।
ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকেও কয়েক দিন ধরে সরবরাহ কমেছে। সাধারণত কেন্দ্রটি বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া ও কয়লা সরবরাহের সমস্যায় তা ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটে নেমেছে।
আদানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হলে উৎপাদন আবার বাড়ানো সম্ভব হবে।
এ ছাড়া রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে। বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে।
গ্যাস ও কয়লার উৎপাদন কমে গেলে দ্রুত ঘাটতি পূরণের অন্যতম উপায় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো। দেশে এ ধরনের কেন্দ্রেরও উল্লেখযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।
তবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কয়েক গুণ বেশি। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি গড় ব্যয় প্রায় ২০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
এ কারণে সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে লোডশেডিং কমাতে তেলচালিত কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হলেও রাত গভীর হলে অনেক কেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে মধ্যরাতের পর কোনো কোনো সময়ে লোডশেডিং আবার বেড়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পিডিবির পাওনা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। বিভিন্ন হিসাবে এ বকেয়ার পরিমাণ ৪৮ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনাই প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।
বকেয়া না পাওয়ায় অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নতুন করে জ্বালানি কিনতে সমস্যায় পড়ছে। সীমিত জ্বালানি মজুত নিয়ে কোনো কোনো কেন্দ্র রাত পর্যন্ত উৎপাদন চালিয়ে পরে তা কমিয়ে দিচ্ছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর পাওয়া বাড়তি অর্থ দিয়ে বকেয়ার পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবি। তবে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থসংকট দ্রুত সমাধান না হলে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।