
নতুন অর্থবছর শুরু হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেল এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রশাসনিক পর্যালোচনার ধাপ শেষ না হওয়ায় নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে এখনো কোনো গেজেট বা বাস্তবায়ন নির্দেশনা জারি হয়নি। ফলে নতুন মূল বেতন, কার্যকর হওয়ার তারিখ, ভাতা, পেনশন ও অ্যারিয়ার—সবকিছু নিয়েই অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) পর্যন্ত নবম পে-স্কেল সংক্রান্ত কোনো গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হয়নি। একই দিন অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, গেজেট প্রকাশের আগে পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো বা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বর্তমানে সচিব কমিটির পর্যালোচনা ও সুপারিশ চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এরপর অর্থ বিভাগের যাচাই এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই গেজেট প্রকাশ ও বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হবে।
নতুন বেতন কাঠামোতে সম্ভাব্য আর্থিক ব্যয়, গ্রেডের সংখ্যা, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বিভিন্ন ভাতা এবং পেনশনের প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তাই এখনও একাধিক প্রশাসনিক ও নীতিগত ধাপ বাকি রয়েছে।
সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয় সামাল দেওয়া। মূল বেতন বাড়লে শুধু বেতন নয়, বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, গ্র্যাচুইটি, অবসর সুবিধা এবং পেনশন বাবদ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন করলে সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে।
এ কারণে পে-স্কেল একবারে কার্যকর করা হবে নাকি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে—তা নিয়েও আলোচনা চলছে। একটি সম্ভাব্য প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করে পরে বিভিন্ন ভাতা সমন্বয় করা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে পেনশনভোগীরাও নতুন পে-স্কেল নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন। মূল বেতন বাড়লে পেনশন কীভাবে সমন্বয় হবে, সর্বনিম্ন পেনশন বাড়বে কি না এবং পুরোনো ও নতুন পেনশনভোগীদের সুবিধার ব্যবধান কীভাবে নির্ধারণ করা হবে—এসব বিষয়ও এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। সমন্বিত বাজেট ও হিসাবব্যবস্থা (আইবিএএস++)-এ নতুন বেতন ম্যাট্রিক্স যুক্ত করা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট ও সার্ভিস রেকর্ড হালনাগাদ করার কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তবে ১৬ জুলাই পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পৃথক সরকারি নির্দেশনা জারি হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার চাইলে গেজেট পরে প্রকাশ করেও পূর্ববর্তী কোনো তারিখ থেকে পে-স্কেল কার্যকর দেখাতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সময়ের বকেয়া বা অ্যারিয়ার পরিশোধ করতে হবে। তবে কার্যকর হওয়ার তারিখ, অ্যারিয়ারের হিসাব এবং অর্থ ছাড়ের সময়সূচি গেজেট প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।
২০১৫ সালের বেতনকাঠামো কার্যকর হওয়ার পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয়, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন পে-স্কেলকে শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৃষ্টি রয়েছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের দিকে—সচিব কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ, মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং গেজেট প্রকাশ। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই নতুন গ্রেড, বেতন, ভাতা, পেনশন ও কার্যকর হওয়ার তারিখ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যাবে।