
ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ক্রিকেটার স্যার গ্যারি সোবার্স আর নেই। ৮৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। তার মৃত্যুতে বিশ্ব ক্রিকেটে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং— ক্রিকেটের তিন বিভাগেই অসাধারণ দক্ষতার জন্য সোবার্সকে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রয়াত কিংবদন্তি ধারাভাষ্যকার ও সাবেক অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক রিচি বেনো একবার তাকে আখ্যায়িত করেছিলেন “বিশ্ব ক্রিকেটে দেখা সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার” হিসেবে। বেনোর ভাষায়, সোবার্স ছিলেন একাধারে দুর্দান্ত ব্যাটসম্যান, অসাধারণ ফিল্ডার এবং নতুন বল, বাঁহাতি স্পিন ও রিস্ট স্পিন— সব ধরনের বোলিংয়েই সমান কার্যকর একজন বোলার।
১৯৩৬ সালে বার্বাডোসে জন্ম নেওয়া সোবার্স মাত্র ১৬ বছর বয়সেই প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক করেন। ১৯৫৩ সালে বার্বাডোসের হয়ে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে খেলার পর অল্প সময়ের মধ্যেই জায়গা করে নেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে। ১৯৫৪ সালে টেস্ট অভিষেকের মাধ্যমে শুরু হয় তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটযাত্রা।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে কিংস্টনে খেলেন ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় ইনিংস। সেই ম্যাচে অপরাজিত ৩৬৫ রান করে গড়েন এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের বিশ্বরেকর্ড, যা টিকে ছিল দীর্ঘ ৩৬ বছর। পরে ১৯৯৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আরেক কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা ৩৭৫ রান করে সেই রেকর্ড ভাঙেন।
স্যার গ্যারি সোবার্সের আরেকটি ঐতিহাসিক কীর্তি আসে ১৯৬৮ সালে। ইংল্যান্ডের সোয়ানসিতে গ্ল্যামরগানের সেন্ট হেলেন্স মাঠে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে এক ওভারের ছয়টি বলেই ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়ে ইতিহাস গড়েন তিনি। স্বীকৃত ক্রিকেটে এটিই ছিল প্রথম ছয় বলে ছয় ছক্কার ঘটনা।
প্রায় দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৯৩টি টেস্ট খেলেন সোবার্স। ৫৭.৭৮ গড়ে ৮,০৩২ রান করার পাশাপাশি বল হাতে নেন ২৩৫টি উইকেট। ৫ হাজারের বেশি টেস্ট রান করা ব্যাটারদের মধ্যে তার ব্যাটিং গড় এখনও ইতিহাসের অন্যতম সেরা।
প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটেও ছিলেন সমান উজ্জ্বল। ৩৮৩ ম্যাচে ২৮ হাজারের বেশি রান এবং এক হাজারের বেশি উইকেট নিয়ে গড়েছেন অনন্য এক কীর্তি। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে সাউথ অস্ট্রেলিয়া ও নটিংহ্যামশায়ারের হয়েও খেলেছেন এই কিংবদন্তি।
১৯৭৪ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন সোবার্স। পরবর্তীতে উইজডেন জানায়, দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, হাঁটুর চোট এবং টানা ক্রিকেট ও ভ্রমণের চাপই ছিল তার অবসরের অন্যতম কারণ।
ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৫ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবার তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। এরপর থেকেই তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হন ‘স্যার গ্যারি সোবার্স’ নামে।
তার মৃত্যুতে শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ নয়, বিশ্ব ক্রিকেট হারাল এমন এক কিংবদন্তিকে, যার কীর্তি, পরিসংখ্যান ও প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্রিকেটপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করবে। ক্রিকেট ইতিহাসে স্যার গ্যারি সোবার্সের নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।