
দেশে বিকল্প মাংস উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে আফ্রিকা থেকে উটপাখি আমদানি করেছিল বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)। তবে ১৩৪ কোটি টাকার ‘পোলট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্প’-এর মেয়াদ শেষ হতে চললেও উটপাখি গবেষণার দৃশ্যমান কোনো সাফল্য পাওয়া যায়নি। বরং গবেষণার জন্য আনা ২২টি উটপাখির মধ্যে বর্তমানে মাত্র চারটি জীবিত থাকায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ আগামী ৩০ জুন শেষ হচ্ছে। প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল আফ্রিকান উটপাখিকে বাংলাদেশের পরিবেশে অভিযোজিত করা, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক খামার সম্প্রসারণের ভিত্তি তৈরি করা।
বিএলআরআই ২০২০ সালে প্রথমে সাতটি এবং পরে আরও ১৫টি অপ্রাপ্তবয়স্ক উটপাখি আমদানি করে। সে সময় প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিম সরকার দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া উটপাখি পালনের জন্য উপযোগী এবং এটি দেশের মাংস উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পূর্ণবয়স্ক উটপাখির ওজন ১০০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে এবং একটি পাখি তিনটি দেশীয় গরুর সমপরিমাণ মাংস সরবরাহ করতে সক্ষম। পাশাপাশি ২০২৩ সাল থেকেই বাণিজ্যিকভাবে উটপাখির মাংস বাজারজাতের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল।
তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষে সেই প্রত্যাশার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। দেশে এখনো উটপাখির কোনো বাণিজ্যিক খামার গড়ে ওঠেনি, বাজারজাতকরণও শুরু হয়নি। গবেষণার জন্য আনা ২২টি উটপাখির মধ্যে বর্তমানে মাত্র চারটি রয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, গবেষণার জন্য আনা ১৮টি উটপাখি জবাই করা হয়েছে। একইভাবে ২০২৩ সালে গবেষণাধীন ৩৮টি মোরগও জবাই করা হয়। প্রাণিসম্পদ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কোনো প্রাণীর অভিযোজন ও প্রজনন গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রাণী সংরক্ষণ অপরিহার্য। গবেষণার অধিকাংশ প্রাণী হারিয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদি জিনগত উন্নয়ন বা জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
উটপাখির পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় টার্কি, তিতির, কোয়েল ও আঁচিল মুরগি নিয়ে গবেষণা কার্যক্রমও শুরু হয়েছিল। তবে এসব প্রাণীর তথ্য-উপাত্ত নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বেশিরভাগ টার্কি ও আঁচিল মুরগি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই জবাই করা হয়েছে। এমনকি এসব প্রাণীর মাংস বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।
প্রকল্পের আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো সৈয়দপুর আঞ্চলিক কেন্দ্র। সেখানে প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো ১ হাজার ২০০টি কোয়েল পাখি মারা গেলেও মৃত্যুর তথ্য যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই পরবর্তীতে আরও এক হাজার কোয়েল ওই কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয় বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক (সাময়িক দায়িত্ব) ড. শাকিলা ফারুক বলেন, উটপাখি বাংলাদেশের দেশীয় পাখি নয়। তাই এটিকে দেশের পরিবেশে অভিযোজিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে।
গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি জানান, উটপাখির পরিবেশগত অভিযোজন, উৎপাদনক্ষমতা, প্রজনন সক্ষমতা এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। খাবারে কত শতাংশ প্রোটিন থাকলে ভালো ফল পাওয়া যায়, সে বিষয়েও গবেষণা করা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে একজন গবেষক ইতোমধ্যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
২২টি উটপাখির মধ্যে ১৮টি কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, মাংসের গুণগত মান পরীক্ষা করার জন্য কিছু পাখি জবাই করা হয়েছিল।
তবে প্রকল্পের সামগ্রিক অর্জন, গবেষণার ফলাফল এবং প্রাণীগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত জানতে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ফলে প্রকল্পের বিপুল ব্যয়, গবেষণার বাস্তব অর্জন এবং প্রাণী ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।