রাজশাহী জেলার মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নতুন কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে আকস্মিকভাবে দূরপাল্লা ও আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সোমবার (১৮ মে) সকাল সাড়ে ৮টার পর থেকে রাজশাহী মহানগর ও জেলার সব বাস টার্মিনাল থেকে কোনো বাস নির্ধারিত রুটে ছেড়ে যায়নি। এতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রা করা হাজারো যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শ্রমিকদের একটি অংশ হঠাৎ করেই বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। এরপর নগরীর প্রধান বাস টার্মিনালগুলোতে কাউন্টারগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং যাত্রীদের টিকিট থাকা সত্ত্বেও বাসে উঠতে দেওয়া হয়নি। জরুরি কাজে বের হওয়া অনেক যাত্রীকে শেষ পর্যন্ত বাসস্ট্যান্ড থেকে ফিরে যেতে হয়।
যাত্রীরা জানান, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। কেউ আগে থেকে টিকিট কেটে রেখেছিলেন, কেউ আবার ভোরেই বাসস্ট্যান্ডে এসে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু বাস না ছাড়ায় তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। বিকল্প পরিবহনও সহজে না পাওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
এক যাত্রী বলেন, তিনি ঢাকায় অফিসের কাজে যাচ্ছিলেন। সকালে নির্ধারিত সময়ের আগেই বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখেন সব কাউন্টার বন্ধ। বাধ্য হয়ে তাকে ফিরে যেতে হয়। আরেক যাত্রী জানান, আগে থেকেই টিকিট কাটা ছিল, কিন্তু হঠাৎ বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি কোনো সমাধান পাননি।
শ্রমিকদের পক্ষ থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন রোববার রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের ২১ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা করে। ওই কমিটিতে রফিকুল ইসলাম পাখিকে সভাপতি এবং মোমিনুল ইসলাম মোমিনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। তবে এই কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করেই মূল বিরোধের সূত্রপাত।
শ্রমিকদের একটি অংশ দাবি করেছে, নির্বাচন ছাড়া কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, যা তারা মেনে নিতে রাজি নয়। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা সংগঠনের নিয়ম ও শ্রমিকদের স্বার্থের পরিপন্থী। এ কারণে তারা কমিটি বাতিল করে তিন মাসের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠন এবং দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানাচ্ছেন।
বাস চলাচল বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। অনেকে চিকিৎসা, ব্যবসা, চাকরি বা জরুরি পারিবারিক প্রয়োজনে ভ্রমণ করছিলেন। বাস না চলায় বিকল্প যানবাহনের ওপর চাপ বেড়ে যায়, যার ফলে ভাড়া বৃদ্ধি ও যানজটের পরিস্থিতিও তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন অনেকে।
যাত্রীদের অভিযোগ, শ্রমিক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষকে বারবার ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। তারা দ্রুত সমস্যার সমাধান এবং স্বাভাবিক পরিবহন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
স্থানীয় পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমিক ইউনিয়নের কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। এর আগেও গত ২৩ এপ্রিল রাজশাহীর শিরোইল এলাকায় ইউনিয়ন কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শ্রমিকদের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি শান্ত করতে পরে সমঝোতার ভিত্তিতে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে সেই সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে এবং পরিবহন খাতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত সমাধান না হলে রাজশাহীর পরিবহন ব্যবস্থা আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য অচল হয়ে পড়তে পারে।
শ্রমিক ইউনিয়নের নতুন কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম পাখি জানিয়েছেন, বাস চলাচল বন্ধের বিষয়টি তিনি জেনেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে এখনো পর্যন্ত বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়নি, ফলে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়