
প্রখর রোদ, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা শীতের কুয়াশা—কোনো প্রতিকূলতাই থামাতে পারে না তাকে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মফিজ উদ্দিন এখন স্থানীয় কৃষকদের কাছে শুধু একজন সরকারি কর্মকর্তা নন, বরং নির্ভরতা, আস্থা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক।
যখন কোনো কৃষকের জমিতে রোগবালাই দেখা দেয়, ফসল ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয় বা আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি বিষয়ে পরামর্শের প্রয়োজন হয়, তখন সবার আগে যে নামটি উচ্চারিত হয় তিনি হলেন মফিজ উদ্দিন। এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ডান হাত হারালেও তিনি হারাননি দায়িত্ববোধ ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছা।
হলিধানী ব্লকে প্রায় ৪ হাজার ৫৫৩ জন কৃষক রয়েছেন, যারা ধান, গম, ভুট্টা, সবজি ও মসলাজাতীয় ফসল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব কৃষকের কাছে মফিজ উদ্দিন এখন একজন পরামর্শক ও অভিভাবক হিসেবে পরিচিত।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালিচরণপুর ইউনিয়নের ছোট মান্দারবাড়িয়া গ্রামের সন্তান মফিজ উদ্দিন। সাত ভাই ও দুই বোনের বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা তিনি শৈশব থেকেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন গড়েছেন। শিক্ষাজীবনে কৃষি বিষয়ে বিভিন্ন ধাপে ডিপ্লোমা ও স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি।
তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হয় ২০০৯ সালের ১১ জানুয়ারি। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাকের চাপায় তার ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসা ও মানসিক সংগ্রামের মধ্যেও তিনি ভেঙে না পড়ে নতুন করে জীবন শুরু করেন।
পরে ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। চাকরিজীবনের শুরু যশোরে, পরে বরিশাল ও ফরিদপুরে দায়িত্ব পালনের পর ২০২২ সালে তিনি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ব্লকে যোগ দেন। এরপর থেকেই মাঠপর্যায়ে সক্রিয় কাজের মাধ্যমে কৃষকদের আস্থা অর্জন করেন তিনি।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষায়, মফিজ উদ্দিনের প্রকৃত অফিস কোনো ভবন নয়—তার অফিস কৃষকের মাঠ। সরকারি ছুটির দিনেও তিনি কৃষকের ডাকে সাড়া দিয়ে জমিতে ছুটে যান। রোগ শনাক্ত, পরামর্শ ও তাৎক্ষণিক সমাধান—সবই করেন মাঠেই।
কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “ধানের জমিতে সমস্যা হলে আগে খুব চিন্তায় পড়তাম। এখন মফিজ ভাইকে ফোন দিলেই তিনি চলে আসেন। এক হাত না থাকলেও কাজে কখনো তাকে দুর্বল মনে হয়নি।”
আরেক কৃষক আলামীন বলেন, “তিনি আমাদের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করেন। তাই আমরা তাকে পরিবারের সদস্যের মতোই দেখি।”
কৃষাণী রওশন আরা বেগম বলেন, “সবজি চাষে সমস্যা হলে তিনি নিজে এসে দেখে যান। তার কারণে আমরা অনেক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি।”
মফিজ উদ্দিন বলেন, দুর্ঘটনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি আর এগোতে পারবেন না। কিন্তু কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছাই তাকে শক্তি দিয়েছে। তার মতে, “কোনো পুরস্কার বা সম্মান নয়, কৃষকের মুখের হাসিই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুর-এ-নবী বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার কাজে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে কৃষকদের মধ্যে গভীর আস্থা অর্জন করেছেন।
একটি হাত হারিয়েও জীবনযুদ্ধে থেমে না যাওয়া মফিজ উদ্দিন তাই ঝিনাইদহের কৃষকদের কাছে শুধু একজন কর্মকর্তা নন—তিনি সাহস, অধ্যবসায় ও মানবিকতার এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।