
চুল মানুষের সৌন্দর্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বর্তমান সময়ে চুল পড়া ও চুলের নানা সমস্যা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকেরই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ‘অর্গানিক’ তেল ও হেয়ার প্যাকের চটকদার বিজ্ঞাপনও বাড়ছে। এসব পণ্যে মেথি, কালোজিরা, পেঁয়াজের রস, কারিপাতা, জবা ফুল কিংবা আমলকীর মতো উপাদান ব্যবহারের কথা বলা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে শতভাগ চুল পড়া বন্ধ ও নতুন চুল গজানোর দাবি করা হয়।
চুল পড়ার সমস্যায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অনেক মানুষ এসব বিজ্ঞাপনের আকর্ষণীয় দাবিতে সহজেই প্রভাবিত হন। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এসব প্রাকৃতিক উপাদান কি সত্যিই চুল পড়া বন্ধ করে নতুন চুল গজাতে পারে, নাকি এর পেছনে রয়েছে মূলত বাণিজ্যিক প্রচারণা?
চুলের যত্নে জবা ফুল, পেঁয়াজের রস, মেথি, কালোজিরা ও আমলকীর মতো উপাদান দীর্ঘদিন ধরেই ঘরোয়া উপায়ে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এসব উপাদানে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটোরি উপাদান রয়েছে, যা স্ক্যাল্পের স্বাস্থ্যের জন্য কিছুটা উপকারী হতে পারে।
তবে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উপাদান সরাসরি মাথার ত্বকে ব্যবহার করলেই চুল পড়া বন্ধ হবে কিংবা নতুন চুল গজাবে—এমন শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।
নর্দার্ন ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডার্মাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাসনীম খাঁন জানান, কিছু উপাদান নিয়ে প্রাণীর ওপর গবেষণায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলেও মানুষের ক্ষেত্রে সেগুলোর কার্যকারিতার জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে রোজমেরি তেল ব্যবহারে কিছু ইতিবাচক ফলাফলের কথা তিনি উল্লেখ করেন।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (NHS) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ১০০টি চুল ঝরে পড়া স্বাভাবিক। চুল পড়া অনেক সময় সাময়িকও হতে পারে। মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন, পুষ্টির ঘাটতি কিংবা স্ক্যাল্পের সংক্রমণের মতো বিভিন্ন কারণে চুল পড়তে পারে।
তবে পুরুষ ও নারীর বংশগত বা প্যাটার্ন বল্ডনেসের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এটি সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী প্রক্রিয়া এবং এ ধরনের সমস্যায় ঘরোয়া ভেষজ উপাদান ব্যবহারে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চুলের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি শরীরের ভেতর থেকে পাওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অ্যালোভেরা, আমলকী, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন খাবারে থাকা ভিটামিন ও খনিজ উপাদান শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে এসব উপাদান মাথায় মাখলেই একইভাবে শরীরে শোষিত হবে—এমনটা নয়।
যেমন, চুলে ডিম মাখলে সরাসরি চুলের পুষ্টি বাড়বে—এমন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং সুষম খাদ্যের মাধ্যমে শরীর প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও পুষ্টি পেলে তা চুলের স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখে যেকোনো হেয়ার প্যাক বা তেল ব্যবহারের আগে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে পণ্যের উপাদান, তৈরির প্রক্রিয়া ও সংরক্ষণকাল সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে এসব পণ্য ব্যবহার না করাই ভালো।
চিকিৎসকদের মতে, যাদের মাথার ত্বক অতিরিক্ত তৈলাক্ত, তারা বেশি তেল ব্যবহার করলে চুল পড়া বা খুশকির সমস্যা আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত শুষ্ক বা কোঁকড়া চুলে তেল কন্ডিশনার হিসেবে কিছুটা উপকারী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চুলের ফলিকল নষ্ট হয়ে গেলে তা স্বাভাবিকভাবে পুনরায় তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই চুল পড়ার কারণ নির্ণয় না করে শুধু বিভিন্ন ‘ম্যাজিক’ তেল বা ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
চুল পড়ার পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে কিংবা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলতে থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে চুল পড়ার কারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ঘরোয়া উপাদান দিয়ে স্ক্যাল্পে ম্যাসাজ করলে সাময়িকভাবে আরাম বা রক্তসঞ্চালনে সহায়তা মিলতে পারে। তবে এগুলোকে চুল পড়া বন্ধ বা নতুন চুল গজানোর ‘জাদুকরী সমাধান’ মনে করা ঠিক নয়। সুষম খাদ্যাভ্যাস, চুলের সঠিক যত্ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শই চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।