
জাতীয় সংসদে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী সংযোজন করে অর্থ বিল-২০২৬ পাস হয়েছে। সংশোধনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রত্যাহার।
সোমবার (২৯ জুন) অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়।
বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর অর্থমন্ত্রী কয়েকটি প্রস্তাবে সংশোধনী আনেন। সংশোধিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী—
এর আগে প্রস্তাবিত বাজেটে এই সীমা যথাক্রমে ৩ লাখ ৭৫ হাজার, ৪ লাখ এবং ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব ছিল।
অর্থমন্ত্রী জানান, বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত প্রস্তাবটিও প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রকৃত বাজারমূল্যের পরিবর্তে অনেক জমি মৌজা মূল্যে নিবন্ধিত হওয়ায় করদাতাদের জটিলতা কমানোর উদ্দেশ্যে এ প্রস্তাব আনা হয়েছিল। তবে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ায় সরকার তা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
একই কারণে আরও দুটি প্রস্তাবও বাতিল করা হয়েছে। এগুলো হলো—বেশিরভাগ ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করা এবং বণ্টন দলিল (পার্টিশন ডিড) ও নামজারি (মিউটেশন) নিবন্ধনের জন্য টিআইএন সনদ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা।
এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়কর হার বিদ্যমান ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে।
পার্বত্য তিন জেলা ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান কর-সুবিধাও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে ব্যবসা, কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আয়ের পাশাপাশি বেতনভিত্তিক আয়ও করমুক্ত থাকবে।
চিংড়ি শিল্পকে সহায়তা দিতে আমদানি করা চিংড়ির খাদ্য, প্রোবায়োটিক, ভিটামিন, খনিজ, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব পাস হয়েছে।
এ ছাড়া দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-সুবিধা বাড়ানো, ওষুধ ও উৎপাদন শিল্পে ব্যবহৃত আমদানি করা মধুর ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফায়ার ডোর তৈরির কোল্ড-রোলড শিট, ফ্ল্যাট স্টিল পণ্যে ব্যবহৃত কোটেড ক্রোমিয়াম অক্সাইড, বৈদ্যুতিক কেবল উৎপাদনে ব্যবহৃত রিফাইন্ড কপার ওয়্যার এবং আমদানি করা ফায়ার ব্রিকের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক ও ভ্যাটও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
দেশীয় কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে অপরিশোধিত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এলইডি বাতি এবং প্রিফ্যাব্রিকেটেড ভবনের কাঁচামাল আমদানির বিদ্যমান শুল্ক-সুবিধার মেয়াদ ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে আনুষ্ঠানিক অর্থপ্রদান উৎসাহিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইন মার্কেটপ্লেসসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের আশা, এতে অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রদান কমবে এবং কর পরিপালন বাড়বে।
এ ছাড়া সোনা, প্লাটিনাম ও হীরার গহনার ওপর নির্দিষ্ট ভ্যাট ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং রুপার গহনার ওপর ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিটিআরসির সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি চুক্তির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি, সরবরাহকারী পর্যায়ে সব ধরনের মাছ সরবরাহে পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাসের ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও অর্থ বিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর পরিপালন সহজ করতে নির্বাচিত কয়েকটি খাতে ভ্যাট ব্যবস্থার কো-ইফিশিয়েন্ট দাখিলের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।