
সবুজ পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পাসের জন্য পরিচিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশ অধিদফতরের অনুমতি ছাড়াই পরিবহন দফতরের নতুন ভবনের জন্য পাহাড়ের একটি অংশ কেটে সমতল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দফতরের পাশের একটি পাহাড়ে বর্তমানে নির্মাণকাজ চলছে। সরেজমিনে দেখা যায়, মূল ফটক বন্ধ থাকলেও ভেতরে শ্রমিকরা কাজ করছেন। সেখানে একটি খননযন্ত্র (এক্সকাভেটর), নির্মাণসামগ্রী এবং কাটা কয়েকটি গাছ দেখা যায়। পাহাড়ের প্রায় ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার একটি অংশ ইতোমধ্যে সমতল করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১ এপ্রিল পরিবহন দফতরের নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রথম ধাপে প্রায় ১১ হাজার বর্গফুট এলাকায় ভবনের একটি অংশ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আগামী বছরের মার্চের মধ্যে এ ধাপের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে প্রায় ২২ হাজার বর্গফুট এলাকায় তিনতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত) অনুযায়ী পরিবেশ অধিদফতরের পূর্বানুমতি ছাড়া পাহাড় বা টিলা কাটা নিষিদ্ধ। তবে জাতীয় স্বার্থে বিশেষ ক্ষেত্রে অনুমোদন সাপেক্ষে পাহাড় কাটার সুযোগ রয়েছে।
গাছ ও পাহাড় কাটার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ বলেন, কতটি গাছ কাটা হয়েছে বা কী পরিমাণ পাহাড় অপসারণ করা হয়েছে, তা এই মুহূর্তে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তার ভাষ্য, এখন পর্যন্ত পাহাড়ের ঢালের ভেঙে পড়া অংশেই কাজ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, দেশের যেকোনো স্থানে পাহাড় কাটতে হলে পরিবেশ অধিদফতরের অনুমতি নিতে হয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম জেলা পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান জানান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণের বিষয়ে একটি চিঠি দিয়েছিল। তবে সেখানে পাহাড় কাটার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। যদি পাহাড় কাটার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরাও। পরিবেশবিষয়ক সংগঠন আওয়ার গ্রিন ক্যাম্পাস-এর সভাপতি মো. মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, ভবন নির্মাণের জন্য পাহাড় কাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিবেশের ক্ষতি না করে বিকল্প স্থানে ভবন নির্মাণ করা যেত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সমাজসেবা ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক তাহসিনা রহমান অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের মতামত ও পরিবেশগত বিষয় বিবেচনা না করেই প্রশাসন একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য Mohammad Al-Forkan পাহাড় কাটার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পাহাড় কাটছে না; কেবল সামান্য একটি অংশ সমান করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদফতরের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন বলে জানান।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের সুপারনিউমারি অধ্যাপক Kamal Hossain বলেন, নতুন স্থাপনা নির্মাণের সময় পাহাড়ের ক্ষতি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। তার মতে, চট্টগ্রামের পাহাড়ের মাটি তুলনামূলকভাবে অস্থিতিশীল। তাই পাহাড় কাটলে ভূমিধস ও অন্যান্য পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়তে পারে। উন্নয়ন কার্যক্রম এমনভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত, যাতে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে।